প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৯ জুন, ২০২৩ । ১০:২৮ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

ওসি আলমগীর এর মানবিকতা, ৭মাস পর সুজন মিয়া ফিরে পেলেন পরিবার

আলমগীর হোসেন রনি

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করতে এসে আমরা নানাবিদ ঘটনার মুখোমুখি হই। আমাদেরকে অত্যন্ত ধৈর্য ও মেধা খাটিয়ে কাজ করতে হয়।

চলতি বছরের ৪ জুন রাঙ্গামাটি জেলার জুরাছড়ি থানাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সীমান্ত এলাকায় একজন ব্যক্তিকে সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করতে দেখে তাকে আটক করেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর সদস্যগণ জুরাছড়ি থানাধীন যক্ষা বাজার ক্যাম্পে এনে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তার নাম ঠিকানা জানার চেষ্টা করেন। সেই সাথে তার খাবারের ব্যবস্থাও করেন। তার সাথে কথা বলে তার নাম ঠিকানা সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। অতঃপর রাত হয়ে গেলে সেনা সদস্যগণ ক্যাম্প ইনচার্জ ক্যাপ্টেন মোশারফ হোসেন এর নির্দেশে সন্দেহজনক লোকটিকে থানায় নিয়ে আসেন। লোকটিকে আনার পর তার নাম ঠিকানা যতটুকু তাহারা সংগ্রহ করতে পেরেছেন সিডিএমএস এর মাধ্যমে যাচাই করি সে কোন অপরাধী কি না, কোন মামলা আছে কি না। নামের সাথে ঠিকানা মিল না থাকায় কোন তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। লোকটিকে দেখে আমার মনে হয়েছিল লোকটি মানসিকভাবে ঠিক নেই। দেখতে খুবই ক্লান্ত ও রোগাক্রান্ত। সারা শরীর ময়লা নোংরা।

আমি তাকে থানায় পেয়ে প্রথমেই তাকে খাবার খেতে দেই। তার সাথে ব্যাপক আলোচনা করি। কোন সুস্পষ্ট ঠিকানা বা তথ্য জানতে না পেরে এসআই নির্মল ও ডিউটি অফিসার তপনকে দায়িত্ব দেই তার সাথে কথা বলার জন্য। দুইজন অফিসার অনেক চেষ্টা করে তার কাছ থেকে কোন সুস্পষ্ট তথ্য পাইনি।সে এক এক সময় এক এক রকম কথাবার্তা বলে। ঠিকানার বিষয়ে বলতে গেলে সে কোন ঠিকানা দিতে পারতেছে না। দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করার পর তারা যে ঠিকানা সংগ্রহ করতে পারলেন সেই ঠিকানা খোঁজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার সাথে কথা বলার পর জানতে পারে এই নামে কোন গ্রাম বা ঠিকানা নাই। আমি তাকে বিশ্রাম দিতে বলি। তাকে ঘুমানোর ব্যবস্থা করতে বলি। পরদিন সকালবেলায় তার শরীরের পুরনো জামা কাপড় পরিবর্তন করে আমাদের কাছে থাকা পায়জামা ও গেঞ্জি তাকে দেই। তাকে গোসল করার জন্য বলি।

এসএসআই শাহাদাত হোসেন ও কনস্টেবল মোশারফ হোসেন তাকে পুকুরে নিয়ে সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দেন। অত:পর তাকে নাস্তা খাওয়াই। আমি তাকে আমার পাশে বসাই। তাকে বিভিন্ন কৌশলে অনেকক্ষণ কথা বলার পর সে কয়েকটি ঠিকানা দেয়। ময়মনসিংহ জেলায় তার বাড়ি বলে সুস্পষ্ট বোঝা যায় না। ময়মনসিংহ বলতেছে নাকি অন্য কোন জেলার নাম বলতেছে কিছুই ভালো করে বুঝা যায় না। অনুমান করে আমি ময়মনসিং ধরে নেই। ময়মনসিং জেলার থানার নাম তার কথার সাথে মিলাইতে পারিনি। যাইহোক এক পর্যায়ে সে একটি থানার নাম পূর্ব নামে কিছু একটা বলল। ময়মনসিং বিভাগের সকল জেলার থানার নাম খুঁজে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা নামে একটি থানা খুঁজে পাই। তারপর গ্রামের নাম তাকে জিজ্ঞাসা করার পরে সে কয়েকটি গ্রামের নাম বলেন।

আমি পূর্বধলার থানার ওসি সাহেবের সাথে কথা বলে কয়েকটা গ্রামের নাম বলার পর একটি গ্রামের নাম তিনি চিনতে পারেন।

পরবর্তীতে আমি বাংলাদেশ পুলিশের বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে কাজে লাগাই। পুর্বধলা থানার সংশ্লিষ্ট এলাকার বিট অফিসারের সাথে কথা বলি। বিট অফিসারকে লোকটির ছবিসহ পাঠাই। বিট অফিসার এসআই শফিউল্লাহ সংশ্লিষ্ট বিটের ওয়ার্ড মেম্বারদের লোকটি ছবি পাঠানোর পর একজন মেম্বার জনাব মতিউর রহমান তাকে চিনতে পারেন। তখন মেম্বারের কাছ থেকে লোকটির চাচাতো ভাইয়ের নাম্বার পাওয়া যায়। আমি তার চাচাতো ভাই কাজলের সাথে কথা বলে ছবি পাঠিয়ে পুনরায় নিশ্চিত হই।

তিনি জানান তাহারা তার চাচাতো ভাইকে গত প্রায় ছয় সাত মাস হবে তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। তার স্ত্রী সন্তানরা তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। তারা ভেবে নিয়েছে সে হয়তো পৃথিবীতে আর নেই। আমি এই লোকটির গার্ডিয়ানকে থানায় এসে লোকটিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করি। তারা আমাকে জানায় তাহারা খুবই অসহায়। গাড়ি ভাড়া করে আসার মত তাদের সামর্থ্য নাই।

পরবর্তীতে আমি রাঙ্গামাটি জেলার সুযোগ্য পুলিশ সুপার জনাব মীর আবু তৌহিদ বিপিএম (বার) মহোদয়ের সাথে কথা বলে তাকে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি গ্রহণ করি। থানার এএসআই আলমগীর হোসেন ও একজন ফোর্স দিয়ে তাকে তার গ্রামের বাড়িতে পাঠাই। রাঙ্গামাটি জেলা হইতে দীর্ঘ প্রায় ২৬ ঘন্টা জার্নি করার পর তাহারা লোকটিকে নিয়ে নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানায় হাজির হন। অতঃপর পূর্বধলা থানার অফিসার ইনচার্জ এর সহযোগিতায় বিট অফিসার, ডিউটি অফিসার এর উপস্থিতিতে লোকটির আত্মীয়, আপন ভাই স্থানীয় মেম্বারদের মাধ্যমে লোকটিকে তার আপনজনের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়।

এভাবে একটি অসহায়, মানুষিকভাবে অসুস্থ, নিখোঁজ ব্যক্তিকে তার আপনজনের কাছে পৌঁছে দিতে পেরে আমি মানিসক শান্তি পেলাম। এভাবে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঠিকানা সংগ্রহ না করলে হয়তো সে তার আপনজনকে ফিরে পেতো না। সে হয়তো নিরাপদ হেফাজতেই পড়ে থাকতো।

মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি তিনি আমাকে এই কাজ করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছেন।

লেখক পরিচিতি : আলমগীর হোসেন রনি, ইন্সপেক্টর, বাংলাদেশ পুলিশ। বর্তমানে রাঙ্গামাটি জেলার জুরাছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত।

 

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন