প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৩ । ১১:৪১ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

বিপদগামী হচ্ছে উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণরা, মোবাইলে আসক্ত টিনেজাররা

মনিরুল ইসলাম মনির

ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফলের চেয়ে কুফলই বেশি দেখা দিয়েছে গ্রামাঞ্চলে। প্রযুক্তির নেশায় বিশেষ করে মোবাইলের মাধ্যমে গ্রামের তরুণরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এক সময় গ্রামে সন্ধ্যা হলে ছেলে-মেয়েরা পড়ার টেবিলে বসত পড়া-লেখার শব্দ শোনা যেত। আর এখন সে দৃশ্য দেখা যায় না। প্রযুক্তির বিকাশের ফলে সবার হাতে হাতে এখন মোবাইল। সন্ধ্যা হলেই মোবাইল হাতে নদীর ধারে বা রাস্তার পাশে, ব্রিজের ওপর চলে যায়। বসে চলে মোবাইলে গেম খেলা। না হয় বাজির নামে জুয়া খেলা।

মতলব উত্তর উপজেলার উঠতি বয়সের কিশোররা অনলাইন গেমিং এবং অনলাইন বাজিতে অর্থাৎ জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এতে করে পড়াশোনা বিমূখ হবার পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। পুলিশ প্রশাসন তৎপর থাকলেও বন্ধ হচ্ছে না অনলাইন বাজি খেলা।

প্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে নেই চাঁদপুর। শহর কিংবা গ্রাম, সবার হাতেই রয়েছে স্মার্ট ফোন। আর এই স্মার্ট ফোনের বদৌলতে খুব সহজেই অনলাইন বাজি খেলায় জড়িয়ে পড়ছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।

সরজমিনে দেখেছি, উপজেলার গজরা ইউনিয়নের ডুবগী গ্রামের ৬ জন কিশোর গজরা-কলাকান্দা সড়কের এক পাশে বসে মোবাইলে গেম খেলছে আর ৩ জন পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা উপভোগ করছে।

তাদের প্রত্যেকের হাতে ১৫-২৪ হাজার টাকা মূল্যের স্মার্ট মোবাইল রয়েছে। মাথা নিচু করে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে ছোট আকারের মোজা পড়ে এক ধ্যানে সবাই মোবাইলে গেম খেলছে। দোকান, ভবন, গাছতলা কিংবা সড়কের বিভিন্ন স্থানে বসে মাথা ঝুঁকে মোবাইলে জুয়ার আসর বসছে দলবদ্ধভাবে। ফ্রি-ফায়ার, ক্যাসিনো, জেডউইন, বাবু-৮৮, জেডবার্ড, মারবেল, বাজি-৯৯৯, টেনবার্ডটি, পাবজি, লুডু, ক্যারাম বোর্ড, ওয়ান এক্স বেটসহ বহু অনলাইন গেম এবং বাজি খেলাতে আসক্ত হয়ে পড়েছে আগামী প্রজন্ম।

অনলাইন বাজির নেশায় কেউ কেউ পড়াশোনা বাদ দিয়েছে অল্প বয়সেই। বাজির এই অনলাইন জুয়া খুবই লোভনীয় আর আকর্ষণীয় খেলা। মোবাইল গেম, খেলাধুলা, পড়াশোনা, কাজকর্ম বাদ দিয়ে সব সময় এর মধ্যে পড়ে থাকছে শিক্ষার্থী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৮ বছরের যুবক বলেন, ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। কয়েক বছর আগে পড়াশোনা বাদ দিয়েছি। এই বাজি খেলতে গিয়ে আমার লেখাপড়া শেষ। টাকা জমিয়ে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি স্মার্ট মোবাইল কিনেছি। আমার ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমে একাউন্ট আছে। প্রতিদিন এমবি কিনে মোবাইলে বাজি এবং অনলাইন গেম খেলি। সার্ভার বন্ধ থাকলেও ডিপিএন-এর মাধ্যমে এসব গেম ও বাজি খেলা যায় ।

একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সুজন বলেন, আমার এ যাবৎ প্রায় ৫০ হাজার টাকা চলে গেছে মোবাইলে গেম ও বাজি খেলাতে। কোনো লাভ হয়নি, উল্টো পড়াশোনা ক্ষতি এবং চোখসহ শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার সুলতানাবাদ ইউনিয়ের কলেজ পড়ুয়া ছাত্র মিনহাজ বলেন, আমার ৭-৮ মাসে এমবি কিনতে ১০ হাজারের ওপর টাকা চলে গেছে। শুধু টাইম পাস ছাড়া আর কিছু না। মোবাইলে বাজি বা গেম খেললে ছেলেরা মাদক, ইভটিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। একটানা মোবাইলে থাকলে মেধা ও স্বরণ শক্তি কমে যায়।

সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের মুক্তিরকান্দি এলাকার শিক্ষক শরীফ, এনামুল’সহ অনেক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদিন দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত ছোট-বড় ছেলেদের দল বেধে গাছ তলা, রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন স্থানে বসে মোবাইলে বাজি আর গেম খেলে। এছাড়াও উঠতি বয়সের ছেলেদের নিকট চা, বিড়ি বিক্রি করছে। এই বাজি খেলা বহুলাংশে বেড়ে যাচ্ছে। এই অল্প বয়সে অনেকের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইল আসক্তি রোধ করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এসব ছেলে চুরি, ছিনতাই, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ কাজে জড়িয়ে পড়া শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

মতলব উত্তর উপজেলা কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক জিএম ফারুক বলেন, শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামেও পৌঁছে গেছে মোবাইল গেমস। এক সময় সন্ধ্যা নামলে ঘরে ঘরে পড়ার শব্দ শোনা যেত এখন মোবাইল গেমস খেলার জন্য নদীর তীরে চলে যায়। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত গেমস খেলে, সকাল ৯ টায় ঘুম থেকে উঠে।

মতলব উত্তর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মহিউদ্দিন এর সাথে কথা বলেন, অনলাইন ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন বাজি ধরা অ্যাপস-এ বাজি খেলে অনেকেই নিস্ব হয়েছে। ইতোমধ্যে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী অভিযান চালিয়ে পরিচালনা করার পাশাপাশি সচেতনতামূলক সভাও করছি।

সমাজের সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সহযোগীতা চেয়েছেন তিনি। কোনো এলাকায় এরূপ কোনো ধরনের ঘটনা চোখে পড়লে অবশ্যই পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত কবার আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে আমরা চেষ্টা করছি এ অঞ্চলের শিশু কিশোর যাতে জুয়া খেলাসহ অনলাইন মোবাইল গেম এ আসক্ত হয়ে শিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশরাফুল হাসান এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, এ বিষয়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ প্রশাসন দু-একজন করে আটক করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসছে।

আমরা একটি পরিকল্পনা করছি এটি কীভাবে পুরোপুরিভাবে নির্মূল করা যায়। ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে থেকে শুরু করে এই খেলাগুলো কোথায় কীভাবে হয় আপাতত খোঁজ-খবর রাখছি এবং কারা কারা এর সাথে জড়িত এ ব্যাপারে আমরা নজরদারি করছি। এবং অতিদ্রুত স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতন করতে আমাদের প্রতিনিধিরা স্ব-স্ব স্কুল কলেজে গিয়ে কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করবে।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন