প্রকাশের সময়: শনিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩ । ১১:০২ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে চাঁদপুরের ১জন সহ ৪ সদস্য আটক

মো. মাসুদ হোসেন

রাজধানীর ভাটারা থানার অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ কোম্পানি লিমিটেড (এএনএ) নামের বিদেশি বিমানসংস্থার জাঁকজমক পূর্ণ কার্যালয়। এই ঠিকানা ব্যবহার করে পত্রিকায় এএনএ নামের বিমান সংস্থার এয়ার হোস্টেজসহ বিভিন্ন পদে লোভনীয় বেতনে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ফাঁদ পাতে একটি চক্র। এই বিজ্ঞাপন দেখে অন্তত দুই শতাধিক চাকরি প্রার্থী আবেদন করেন। এরমধ্যে থেকে বাছাই করে ১৭০ জনকে চাকরির ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হয়। ইন্টারভিউতে বসার ক্ষেত্রে অগ্রিম দিতে হয় ১ থেকে দুই লাখ টাকা। এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে আরও পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হয়।

মাত্র এক মাসে প্রায় অর্ধশত চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে প্রতারক চক্রের মূলহোতাসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১০। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- ফেনী সদর উপজেলার সৈয়দ কেরানী বাড়ী এলাকার আব্দুর রউফ ফরহাদীর ছেলে এম. এ. হক আলম ফরহাদী (৬০), লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হাছাদী এলাকার আবু তাহেরের ছেলে মেহেরাব হোসেন (২১), নারায়নগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলা বাঘমারা মৌচাক এলাকার মৃত খালেকুজ্জামানের ছেলে মোঃ রাসেল হোসাইন (৩০) ও চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ বোরোচর এলাকার হাফেজ জয়নাল আবেদীনের ছেলে শাহাদাত হোসেন (৩৫)।
এসময় তাদের কাছ থেকে ১৭০টি বিভিন্ন চাকুরী প্রার্থীদের জীবন বৃত্তান্ত, ৪টি বিভিন্ন চাকুরী প্রার্থীদের এপয়েনমেন্ট লেটার, ১ পাতা দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রদত্ত চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি, ১ পাতা টাকা গ্রহনের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র, তিনশ’টি কোম্পানির প্যাড, দুইশ’টি কোম্পানির ভিজিটিং কার্ড, ছয়শ’টি কোম্পানির বড় এবং ছোট খাম, ২টি ল্যাপটপ, ২টি ল্যাপটপ চার্জার, ২টি ক্যাবল, ১টি মনিটর, ২টি কি-বোর্ড, ১টি টেলিফোন, ১টি প্রিন্টার, ১টি ক্যালকুলেটর, ১টি এম. এ হক আলম ফরহাদী কান্ট্রি ডিরেক্টর লেখা সিল, ১টি এএনএ কোম্পানি লিমিটেড লেখা সিল, ১টি হাতঘড়ি, ৬টি মোবাইল ও নগদ এক লক্ষ ৩৮ হাজার পাঁচশত টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

শুক্রবার (২৯ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, চক্রটি মাত্র এক মাসে চটকদার বিজ্ঞাপনে বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়ার নামে শুধুমাত্র ইন্টারভিউর নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রের টার্গেট ছিলো আগামী ছয় মাস চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে ইন্টারভিউ ও প্রশিক্ষণের নামে অন্তত ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি ভাটারায় ড্রাগমা ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে টাকা আদায়ের চুক্তি করে। এর মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসছিলো।

তিনি আরও বলেন, প্রতারক চক্রের মুল হোতা আলম ফরহাদী অল্প কিছু পড়াশোনা করে ফেনীতে নিজ এলাকাকে হোমিওপেথির ওষুধ বিক্রি করতো। পরে ঢাকায় এসে অল্প সময়ে টাকা আয় করতে বিভিন্ন প্রতারণার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। এই প্রতারণা করতে গিয়ে নিজেকে বিসিএস শিক্ষা কর্মকর্তা, দুদক কর্মকর্তা পরিচয় ব্যবহার করতেন। এমন কি ভুক্তভোগী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে তার তিন সন্তান সেনাবাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিতেন।

সম্প্রতি তিনি এএনএ নামের জাপানি এয়ারওয়েজ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে পারে। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নামে ফাঁত পাতেন। মাত্র এক মাসে তার মাধ্যমে প্রতারণার শিক্ষার হয়েছেন শতাধিক চাকরি প্রার্থী। হাতিয়েছেন কোটি টাকা।

গ্রেপ্তার আলম ফরহাদী র‌্যাবে কাছেও ১৮-১৯ বছর ধরে দুদকের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন বলে পরিচয় দেন। যদিও যাচাই-বাছাই করে দেখা যায় তিনি সরকারি কোনো পদেই নেই। ফরহাদীর বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের দুটি মামলা রয়েছে।

র‌্যাব-১০ এর এই কর্মকর্তা আরও জানান, গ্রেপ্তার মেহেরাব হোসেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। চাকরির খোঁজ করতে ফরহাদীর সঙ্গে পরিচয়। পরবর্তী মোটা অংকের টাকা বেতনের প্রলোভনে সে এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করত। শাহাদাত হোসেন পড়ালেখা শেষ করে বেকার ছিলেন। এর আগে সে কয়েক মাস একটি এয়ার টিকেটিং কোম্পানীতে চাকরি করত। সহকর্মীর মাধ্যমে ফরহাদীর সঙ্গে পরিচয় হলে চক্রে যোগ দিয়ে রিজার্ভেশন অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করে।

রাসেল হোসাইন পড়াশোনা শেষ চাকরির খুঁজতে গিয়ে ফরহাদীর সঙ্গে পরিচয়। পরে ফরহাদীর নতুন অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করে। গ্রেপ্তার প্রতারক চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

আরো জানা যায়, চলতি মাসের গত ৫ তারিখে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে “ANA (All Nippon Airways) Co. Ltd” নামক একটি এয়ারওয়েস প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে চাকুরী প্রদান করবে মর্মে বিজ্ঞাপন প্রদান করে। উপরোক্ত বিজ্ঞাপন দেখে ভিকটিম ঢাকা মগবাজার কাটা কলোনী এলাকার আব্দুল মতিন এর ছেলে মোঃ মাইন ও তার ভাতিজা মাসুদুল ইসলাম আপন (২১) এবং তার অপর পরিচিত জুই আক্তার (১৯) দ্বয় মিলে গত ১০ তারিখে উক্ত এয়ারওয়েস কোম্পানীতে চাকুরীর জন্য উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে যোগাযোগ করলে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ডিরেক্টর এম. এ. হক আলম ফরহাদী ভিকটিমের নিকট নগদ তিন লক্ষ টাকা দাবি করে। ভিকটিমরা আলম ফরহাদীর কথামত গত ২৩ তারিখ শনিবারে পুনরায় তাদের অফিসে গিয়ে নগদ তিন লক্ষ টাকা প্রদান করে এবং চাকুরীর জন্য তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে আসে। অতঃপর ভিকটিমরা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে যে, উল্লেখিত বিজ্ঞাপনে প্রদত্ত এয়ারওয়েজ নামে বাংলাদেশে কোন প্রতিষ্ঠান নেই। পরে ভিকটিমরা আলম ফরহাদীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করে কিন্তু আলম ফরহাদী ভিকটিমদেরকে কোন প্রকার চাকুরী প্রদান এবং তাদের প্রদানকৃত অর্থ ফেরত না দিয়ে তাদের সাথে বিভিন্ন প্রকার তালবাহানা করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ফোন বন্ধ করে তাদের সাথে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। পরবর্তীতে ভিকটিমরা বুঝতে পারে যে, তারা প্রতারণার স্বীকার হয়েছে।

উক্ত ঘটনার পর প্রতারিত ব্যক্তিরা নিরুপায় হয়ে গত বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) উপরোক্ত বিষয়ে র‌্যাব-১০ এর অধিনায়ক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। উক্ত অভিযোগ প্রাপ্তির পর র‌্যাব-১০ এর একটি আভিযানিক দল উল্লেখিত প্রতারক চক্রটিকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধ করে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২৮ ডিসেম্বর) রাতে র‌্যাব-১০ এর একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ও তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় রাজধানী ঢাকার ভাটারা থানাধীন জগন্নাথপুর শহীদ আব্দুল হাফিজ রোড এলাকায় অবস্থিত সুংসিং টাওয়ার এর ২য় তলায় এএনএ অফিসে একটি অভিযান পরিচালনা করে। উক্ত অভিযানে এএনএ নামক এয়ারওয়েস কোম্পানীতে চাকরি দেওয়ার চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শতাধিক বেকার তরুন-তরুণীর সাথে প্রতারণা করে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে প্রতারক চক্রের মূলহোতাসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন