হাজীগঞ্জের দ্বাদশগ্রাম ইউনিয়নের কাপাইকাপ জামে মসজিদে ইমাম নিয়োগকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও মারামারি ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় মসজিদের মুসুল্লী ও স্থানীয়রা বহিরাগতদের দায়ী করে সংবাদকর্মীদের কাছে অভিযোগ এবং প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ন্যায়-বিচার ও বিষয়টি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কাপাইকাপ জামে মসজিদের স্থানীয় ও মুসুল্লীরা উপস্থিত হয়ে সংবাদকর্মীদের কাছে এমন অভিযোগ ও প্রশাসনের সু-দৃষ্টি কামনা করে বক্তব্য দেন। এসময় মসজিদের পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দুই ইমাম উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত শুক্রবার জুমআর নামাজের পর মসজিদে হট্টগোল ও মারামারি ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ও মুসুল্লীরা জানান, কাপাইকাপ জামে মসজিদটি শতবর্ষী হওয়ায় রাস্তার পাশে নতুন করে একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করে হয়। নতুন মসজিদের উদ্বোধনের পূর্বে পুরাতন মসজিদে গত ২ আগস্ট থেকে মাও. খোরশেদ আলম নামের একজন ইমাম দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তারা জানান, মসজিদ কমিটি মাও. খোরশেদ আলমকে নিয়োগ দিয়েছেন। তবে ইমাম নিয়োগের বিষয়ে স্থানীয় ও মুসুল্লীরা তা জানেন না।
এরপর পুরাতন মসজিদটি বন্ধ করে নতুন মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা এবং নতুন করে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। গঠিত কমিটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মুফতি মো. জোবায়ের হোসাইন নামের একজন ইমাম নিয়োগ দেন। তিনি গত পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এর মধ্যে পূর্বের ইমাম মাও. খোরশেদ আলম নতুন মসজিদে উপস্থিত হন এবং তারা দুইজনেই পালা-বদল করে ইমামতির দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে মুসুল্লী’সহ স্থানীয়দের মাঝে বিভিন্ন কথা-বার্তা, আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে এবং দুইজনের মধ্যে একজন ইমাম দায়িত্ব পালনের জন্য গত শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) জুমআর নামাজের পর আলোচনায় বসেন মসজিদ কমিটিসহ মুসুল্লী ও স্থানীয়রা। ওই সময়ে মসজিদে একই গ্রামের অন্য এলাকার মুসুল্লীদের উপস্থিতি দেখা যায়। যারা এই মসজিদ ও এলাকার মুসুল্লী নয়।
পরে আলোচনা শুরুতেই সভাপতি মো. মিজানুর রহমান কমল নিয়মিত মুসুল্লী ও স্থানীয় ছাড়া অন্যদের আলোচনা সভাস্থল ত্যাগ করার অনুরোধ জানান। কিন্তু কেউই সভাস্থল ত্যাগ না করায় সভাপতি মুসুল্লী ও স্থানীদের উদ্দ্যেশে ইমাম নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন। এর মধ্যে মুসুল্লীদের অধিকাংশ মতামত মুফতি জোবায়ের হোসাইনের পক্ষ গেলে একপর্যায়ে হট্টগোল এবং পরে মারামারি শুরু হয়। এতে স্থানীয় কয়েকজন আহত হন।
এ বিষয়ে মো. কবির হোসেন আমিন (৭০) নামের একজন মুসুল্লী জানান, সাবেক মেম্বার (ইউপি সদস্য) শিবলু এই এলাকার মুসুল্লী না। অথচ তিনিসহ কয়েকজন মুসুল্লী ও স্থানীয়দের উপর হামলা করেন এবং সে আমাকে হুমকি-ধমকি দিয়েছে। অথচ আমি তার বাবারও ২০/৩০ বছরের বড়। আমি এর বিচার চাই। ইমামের বিষয়ে তিনি বলেন, কমিটি-মুসুল্লির সিদ্বান্তে ইমাম নিয়োগ চাই।
কামাল হোসেন (৪৫) নামের অপর এক মুসুল্লী বলেন, শিবলু মেম্বারসহ আরও ২/৩ জন আমাকে মারধর করেছে। কিন্তু তারা এই মসজিদের মুসুল্লী না।
আবুল কালাম খাঁন (৭০) নামের এক মুসুল্লী জানান, দুই ইমাম নিয়োগের বিষয়ে মুসুল্লীরা জানেনা। তিনি বলেন, মুসুল্লীরা যা চায়, তাই হবে। বাহিরের লোকের কথায় হবে না।
মো. সামছুদ্দিন খাঁন (৬৫) বলেন, দুইজন ইমাম সমন্বয় করে একজন থাকুক। আর তারা (ইমাম) যদি সমন্বয় না করে, তাহলে কমিটি বিচার-বিশ্লেষণ করে যার যোগ্যতা বেশি, তাকে নিয়োগ দেক।
মুসুল্লী ও দাতা সদস্য ইমরান খাঁন (৬১) বলেন, ওইদিন বাহিরের ২/৩ জন লোকজন হাঙ্গামা করেছে। তারা এই মসজিদের মুসুল্লী না। আমরা চাই, মুসুল্লীরা যাকে পছন্দ করে, তাকে নিয়োগ দেওয়া হোক। তবে আগের ইমাম নিয়োগের বিষয়ে আমরা কেউ জানিনা।
মাসুদ (২৩) নামের স্থানীয় এক যুবক জানান, শিবলু মেম্বার আমাকে মোবাইলে হুমকি দিয়েছেন। যার কল রেকর্ড আমার কাছে আছে। আমিসহ অনেকে নিরাপত্তাহীনতা ভুগছি। এদিকে আইয়্যুব খাঁন (৩৮) নামের অপর এক মুসুল্লী বলেন, শিবুল মেম্বার দোকানে এসে আমাকে হুমকি দিয়েছে।
নতুন মসজিদে নিয়োগকৃত ইমাম মুফতি জোবায়ের হোসাইন বলেন, মসজিদ পরিচালনা কমিটি আমাকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছেন। আমি গত পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে ইমামের দায়িত্ব পালন করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হুজুরের (মাও. খোরশেদ আলম) সাথে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এখন কমিটি ও মুসুল্লীরা যাকে যোগ্য মনে করবেন, তিনিই দায়িত্ব পালন করবেন। আমি ওনাদের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিবো।
পুরাতন মসজিদে নিয়োগকৃত ইমাম মাওলানা মো. খোরশেদ আলম বলেন, আমার সাথে তাঁর (মুফতি জোবায়ের হোসাইন) কোনো দ্বন্দ্ব নেই। মসজিদের বিগত কমিটি আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। যার ফলে আমি গত ২ আগস্ট থেকে ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছি। এরপর নতুন মসজিদে আসার পর আমরা দুইজনেই পালা-বদল করে দায়িত্ব পালন করছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কমিটি ও মুসুল্লীদের সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিবো।
এ বিষয়ে মসজিদের সাবেক কমিটি মো. গিয়াস উদ্দিন মনিরের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নিয়মিত একজন ইমামের নিয়োগের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পরে আমি হজে¦ গিয়েছিলাম। ওইসময়ে কমিটির অন্য সদস্যরা ইমাম নিয়োগ দিয়েছেন। পরবর্তীতে নতুন মসজিদের উদ্বোধন ও নতুন করে কমিটি করা হয়েছে এবং নতুন কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই পূর্বের কমিটি।
ইমামের বিষয়ে তিনি বলেন, পরবর্তীতে জানতে পারলাম নতুন করে ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। যেহেতু মফস্বল এলাকা। দুইজন ইমামের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। সেহেতু আমার মতামত হচ্ছে, কমিটির সদস্য, মসজিদের মুসুল্লী ও এলাকাবাসী মিলে একজন ইমামকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হোক।
বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান কমল বলেন, পুরানো মসজিদে ইমাম নিয়োগের বিষয়ে আমি জানিনা। তবে একজন নিয়মিত ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন। এরপর নতুন মসজিদ উদ্বোধন পূর্বে নতুন করে কমিটি গঠন করার পর আমরা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একজন পেশ ইমাম ও খতিব নিয়োগ দেই। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে তিনি (মাও. খোরশেদ আলম) কমিটির কারো সাথে যোগাযোগ করেন নি।
তিনি বলেন, আমি নিজ বাড়িতে থাকিনা। তবে গ্রামে নিয়মিত আসা-যাওয়া করি। যখন নতুন ইমাম (মুফতি জোবায়ের হোসাইন) দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তখন শুনেছি তিনি (মাও. খোরশেদ আলম) মসজিদে আসেন এবং তারা দুইজনেই পালাবদল করে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। বিষয়টি জানার পর আমি ওনাকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছি তিনি আমার ফোন রিসিভ কিংবা পরবর্তীতে ব্যাকও করেননি।
এসময় তিনি বলেন, এরমধ্যে এক মাস পার হয়েছে। আমরা নতুন ইমাম ও মুয়াজ্জিনের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করেছি এবং তাদের দুইজনকে সহ ইলেকট্রেশিয়ানের বেতন দিয়েছি। কিন্তু তিনি (মাও. খোরশেদ আলম) বেতনের জন্য আমাদের কাছে আসেননি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ওনার বেতন কে দেয়, তিনি কোথায় খাওয়া-দাওয়া করেন ? বিষয়টি আমরা জানিনা। পরবর্তীতে বিষয়টি সমাধানের জন্য বসলে হট্টগোল ও হাতাহাতির সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় ও মুসুল্লীদের অভিযোগের বিষয়ে শিবলু মেম্বারের (সাবেক ইউপি সদস্য) সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি মুঠোফোনে কথা বলবো না। আপনাদের সাথে সরাসরি কথা বলবো। এজন্য আগামি শুক্রবার বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হবে এবং ওই বৈঠক সংবাদকর্মীদের উপস্থিত থাকতে বলেন।
হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, কাপাইকাপ জামে মসজিদে কমিটি ও ইমাম নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ইউএনও মহোদয় জানেন। আমরা আগামি ২/১ দিনের মধ্যে বসবো এবং কমিটির সদস্য ও মুসুল্লী এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিষয়টি মিমাংসা করে দিবো।

প্রিয় চাঁদপুর ডেস্ক