প্রকাশের সময়: রবিবার, ৩ আগস্ট, ২০২৫ । ১০:৪৯ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

শাহতলী রেল স্টেশন: চাঁদপুর রেল ইতিহাসের এক নিঃশব্দ সাক্ষী

মো. আবদুল্লাহ শাকুর
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর চাঁদপুর জেলার শাহতলী এলাকায় অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র অথচ ঐতিহাসিক রেল স্টেশন— শাহতলী রেল স্টেশন। যদিও এটি চাঁদপুর শহরের প্রধান রেলস্টেশন নয়, তবুও একসময় এই স্টেশনটিই ছিল আশপাশের জনপদের যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জনজীবনের কেন্দ্রস্থল। আজ সেই স্টেশনটিই দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে— আধুনিক অবকাঠামোর ছায়ায় স্মৃতিময় জৌলুস হারিয়ে।
ইতিহাসের পাতায় চাঁদপুর রেলওয়ে :
চাঁদপুরে রেলপথের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই, যখন ব্রিটিশদের তৈরি Assam Bengal Railway কোম্পানি লাকসাম– চাঁদপুর মিটার-গেজ রেললাইন চালু করে। এই রেলপথের মূল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসাম অঞ্চলের পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে সহজতা আনা।
চাঁদপুর হয়ে নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল— এসব অঞ্চলেও পণ্য ও মানুষের যাতায়াতের এক নবদ্বার খুলে গিয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় শাহতলী রেল স্টেশন স্থাপিত হয়।
শাহতলী রেল স্টেশন: অবস্থান ও এক সময়কার গুরুত্ব শাহতলী রেল স্টেশন, চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নে অবস্থিত, শহরের মূল বড় স্টেশন থেকে পূর্বদিকে। এই স্টেশনটি একসময় ছিল একটি জমজমাট রেল কেন্দ্র। এখানে ছিল রেল ক্রসিং, প্রতিদিন একাধিক ট্রেন থামত, ঘণ্টার শব্দে মুখর হতো এলাকা।
রেলকর্মীদের মধ্যে ছিল—
▪️স্টেশন মাস্টার (আলাদা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন),
▪️ফয়েস ম্যান,
▪️সিগন্যালম্যান,
▪️গেটম্যানসহ অনেক লোকবল।
এটি ছিলো একপ্রকার কর্মসংস্থানের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন আসতো সিলেট, ভৈরব, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামগামী ট্রেন।
ট্রেন চলাচল ও রেল লাইন: অতীত বনাম বর্তমান 
এক সময় এই স্টেশন দিয়ে সিলেট–ভৈরব রুটের ট্রেনও চলাচল করত। ছিল ৩টি আলাদা রেল লাইন, যার একটি ছিলো শাহতলী বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই লাইনে মালবাহী বগি এসে দাঁড়াতো। সিলেট থেকে ধান, মরিচসহ কৃষিপণ্য এসে বাজারে লোড-আনলোড হতো। বাজারজুড়ে ছিল গদিঘর, প্রাণবন্ত লোকসমাগম।
কিন্তু আজকের বাস্তবতায় সেই ৩ নম্বর লাইনের অস্তিত্বই আর নেই। বাজার পর্যন্ত যাওয়া রেলপথ হারিয়ে গেছে, গদিঘরগুলো পরিত্যক্ত। এমনকি কোলকাতা থেকে আসা বড় মালবাহী জাহাজ একসময় এই বাজারঘাটে ভিড়ত— সে ইতিহাসও মলিন।
বর্তমানে স্টেশনে রয়েছে ২টি লাইন, তারমধ্যে একটি ব্যবহার হয় না। ফলে প্রধান লাইনে ট্রেন থামে, আর সেই লাইনটি প্লাটফর্ম থেকে দুরে এবং মাটি থেকে ট্রোনের সিড়ি উঁচুতে হওয়ায় যাত্রীদের উঠানামায় ভয়াবহ কষ্ট হয়। বর্তমানে কেবল ‘সাগরিকা এক্সপ্রেস’ একমাত্র ট্রেন হিসেবে এখানে থামে। মেঘনা এক্সপ্রেসসহ অন্য ট্রেনগুলো আর শাহতলীতে থামে না।
হারিয়ে যাওয়া জৌলুস ও সংকুচিত কার্যকারিতা :
যেখানে একসময় প্রতিদিন ছিল কয়েকটি ট্রেনের স্টপেজ, স্টাফ কোয়ার্টার, কর্মজীবনের জোয়ার — আজ সেখানে নেই টিকিট কাটার লোকও। নেই স্টেশন মাস্টার, নেই আগের সেই কর্মচঞ্চলতা।বর্তমান ভবন কিছুটা আধুনিক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্টেশন মাস্টারের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি,
ব্রিটিশ আমলে তৈরি কোয়ার্টারগুলো জীর্ণ-শীর্ণ, পরিত্যক্ত ও অনাদরে পচে যাওয়া স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা :
শাহতলী স্টেশনকে কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনতে চাইলে প্রয়োজন:
▪️অতীতের ঐতিহ্য রক্ষায় সংরক্ষণ পরিকল্পনা
▪️স্টাফ কোয়ার্টার ও স্টেশন ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ
▪️আধুনিক টিকিটিং ও যাত্রী সেবা কেন্দ্র
▪️পুনরায় অন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ নিশ্চিতকরণ
▪️ট্রেন ওঠানামা সহজ করতে লেভেল প্ল্যাটফর্ম ও সংযোগ সিঁড়ি নির্মাণ
চাঁদপুর-লাকসাম রেলপথে প্রস্তাবিত ডাবল লাইনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, শাহতলী স্টেশনের গুরুত্ব আবার ফিরে পেতে পারে। শাহতলী রেল স্টেশন এক সময় ছিলো দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ও কৃষিপণ্য বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র।
আজ এটি ইতিহাসের একটি নিঃশব্দ স্তম্ভ, যেখানে আধুনিক ভবন রয়েছে, কিন্তু প্রাণ নেই। আমরা যদি চাই শাহতলী ফিরে পাক তার হারানো গৌর- তাহলে চাই অতীতের সম্মানকে রক্ষা করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। শুধু দালান নয়, এই স্টেশনটির স্মৃতি, ঐতিহ্য ও জীবন্ত সংস্কৃতিও সংরক্ষণ জরুরি।
লেখা ও সম্পাদনায়:
মো. আবদুল্লাহ শাকুর
(ইতিহাস-সন্ধানী ভ্রমণপিপাসু ও হোমিও চিকিৎসক)

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন