প্রকাশের সময়: রবিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ । ৮:৫৯ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলা ভাষার দূষণ রোধে প্রয়োজন সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ

অনলাইন ডেস্ক
  • মোঃ মাসুদ হোসেন :
আমাদের মাতৃভাষা হলো বাংলা। যে ভাষা আমরা জন্মের পর থেকে শুনে আসছি, যে ভাষায় নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করে চলেছি- সেই প্রাণের ভাষা শত সহস্র বছরের বিবর্তনে এটি আজকের রূপ পেয়েছে। এখন আমরা যে বাংলা ভাষা বলি এক হাজার বছর আগে তা ঠিক এমন ছিল না। এক হাজার বছর পরও ঠিক এমন থাকবে না হয়তো। ভাষা এমনই চলমান প্রক্রিয়া, পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি সমৃদ্ধ হয় এবং নতুন রূপে বিকশিত হয়।
ভাষাবিদ ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় আর ড. মুহাম্মদ শহীদউল্লাহর মতে, সংস্কৃত থেকে নয়, প্রাকৃত ভাষা থেকেই উদ্ভব ঘটেছে বাংলা ভাষার। প্রাচীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মনের ভাব প্রকাশের নানা রীতি চালু ছিল। সেখান থেকেই অঞ্চলভেদে উৎপত্তি হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতভাষা। আমাদের এই নদী বিধৌত পূর্ব অঞ্চলের মানুষেরা যে প্রকৃত ভাষায় কথা বলতে, তা হলো মাগধী। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা মাগধি রূপান্তরিত হয়ে বাংলাভাষার উদ্ভব হয়। আর এ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছিল অকুতোভয় সন্তানেরা।
প্রায় ৭০ বছর আগে ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানদের তাজা রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের মাটি। এক অভূতপূর্ব অধ্যায় সংযোজিত হলো মানব ইতিহাসে। সেই অনন্য ইতিহাসকে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেসকো (জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা) ১৯৯৯ সালে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ ছাড়া এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই। আমাদের দেশই পৃথিবীর একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র।
এমন সুন্দর ভাষার জন্য বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বীর সৈনিকদের। যাদের অবদান ও আত্মত্যাগের ফলেই যেমন রক্ষা পেয়েছে বাংলা ভাষার মর্যাদা, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিসংগ্রামের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রতিটি বাঙালি সত্তায় মিশে আছে, যা বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মানুসন্ধানের প্রধান প্রতীক। একমাত্র বাঙালি জাতি ছাড়া পৃথিবীর কোনো জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়নি। এ আমাদের জন্য এক বড় পাওয়া, আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে প্রথমবার বিশ্বদরবারে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলার সঙ্গে বাঙালির যত আবেগ, যত ভালোবাসা, সেটি অন্য কোনো ভাষার ক্ষেত্রে তেমনভাবে আছে কিনা জানা নেই। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রতি আমরা কতটা যত্নশীল, তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ; কারণ চারদিকে চলছে ভাষা বিকৃতির মহোৎসব। বিভিন্ন ইংরেজি শব্দ ও অকথ্য ভাষা, বাংলা ভাষায় এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যে, বাংলা ভাষাকে স্বাভাবিক মানসম্মতভাবে রক্ষা করা যাচ্ছে না।
একইভাবে আজকাল টেলিভিশনে প্রচুর নাটক ও সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে। যেখানে আঞ্চলিক ভাষার প্রচুর প্রয়োগ হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার থাকবেই, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যখন আমরা দেখি যে, মূল স্রোতধারার ভাষায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপভাষাকে এত বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, সেখানে সাধারণ মানসম্মত বাংলা ভাষার ব্যবহার অক্ষুণ্ন থাকছে না। অত্যন্ত রুচিহীনভাবে আমাদের বাংলা ভাষাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে কিছু গণমাধ্যমে, বিশেষ করে টেলিভিশন ও এফএম রেডিওগুলোয়। সেখানে অদ্ভুত বাচনভঙ্গিতে বিকৃত ভাষার ব্যবহার লক্ষণীয়। বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফারসির মিশ্রণ চলছে। আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এ রকম নানা শব্দ ঢুকে বাংলা ভাষাকে দূষিত করছে, বিকৃত করছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও মাতৃভাষাকে এমনভাবে বিকৃত করার নজির আছে কিনা জানা নেই। আমাদের বাঙালিত্বের প্রধান বাহক বাংলা ভাষার অস্তিত্বই যদি হুমকির মধ্যে পড়ে, তাহলে বাঙালি সংস্কৃতিও সসম্মানে টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই আমাদের মাঝে বাংলা হোক প্রাণের স্পন্দন।
বাংলা ভাষা ব্যবহারে নতুন প্রজন্মের মনোবৃত্তির উন্মেষ সাধনকল্পে সময়ে সময়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন ও আলোচনার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এভাবে নতুন প্রজন্ম ছাড়াও সার্বিকভাবে গণসচেতনতা সৃষ্টি করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ভাষা বিকৃতি রোধে আমাদের নিজেদের এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে, কারণ আপনার স্বভাব আপনার ওপরই নির্ভরশীল। স্থান পরিবর্তন করলেও কখনো শুদ্ধ ভাষা জেনেও প্রয়োজনের তাগিদে সেই ভাষার বিকৃতি ঘটানো থেকে আমাদেরই বিরত থাকতে হবে। ভাষা বিকৃতি রোধ করার একমাত্র ও প্রধান উপায় পরিবার ও স্কুল শিক্ষা।
প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু ভাষা শিক্ষা তার পরিবার থেকে পায়, তাই তার পরিবারকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তাদের বাচ্চারা ভাষা বিকৃত করে না ফেলে। এরপর স্কুল শিক্ষকদের কর্তব্য তাদের ছাত্রছাত্রীদের সঠিক ভাষাশিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।
বর্তমান পর্যায়ে দেখা যায় ইংলিশ শিক্ষা বেশি লাভ করতে গিয়ে বাংলা ভাষা ব্যবহার থেকে বেশি ইংলিশ ভাষা ব্যবহার করে থাকে। আমার মতে তাদের প্রয়োজন ছাড়া সঠিক উচ্চারণে বাংলা ভাষা শেখার দিকে নজর দেয়া উচিত, যতটা সে ইংরেজি শিক্ষায় ব্যস্ত। তাই যে করেই হোক দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ ও চর্চা করে বিদেশি অপসংস্কৃতি রোধ করতে হবে। আমাদের দেশপ্রেম, সজাতিপ্রীতি এবং সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে। সর্বোপরি, ভাষাসৈনিকদের তালিকা প্রণয়ন, সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং বাংলা ভাষার দূষণ রোধ করতে সরকারকে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে।
লেখক- মোঃ মাসুদ হোসেন
কলামিস্ট ও সংবাদকর্মী

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন