প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ৩:১৭ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

একজন সাধারণ বাঙালি নারী ছিলেন খালেদা জিয়া

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক আপোসহীন নাম। কিন্তু রাজনীতির এই ইস্পাতকঠিন চরিত্রের আড়ালে একজন সাধারণ বাঙালি নারী ছিলেন তিনি।

যার একটি সুন্দর সংসার ছিল এবং ছিল স্বপ্নময় এক দাম্পত্য জীবন। তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল মা ও একজন নিবেদিতপ্রাণ স্ত্রী। রাজনীতির মাঠে আসার আগে তার পরিচয় ছিল একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী হিসেবে।

কেমন ছিল জিয়াউর রহমানের সাথে তার সেই দিনগুলো কীভাবে কেটেছিল তাদের ২১ বছরের সংসার জীবন চলুন ফিরে দেখা যাক সেই সোনালী ও সংগ্রামী দিনগুলোতে।

বিয়ের পর স্বামী জিয়াউর রহমানের পোস্টিং এবং চাকরির সুবাদে খালেদা জিয়াকেও বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে।

সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে বিয়ে

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে ১৫ বছর বয়সে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়।

দুই পরিবারের সম্মতিতেই ধুমধাম করে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় খালেদার বাবার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন হয়। খালেদা জিয়ার মা ছিলেন জিয়াউর রহমানের মায়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। বিয়ের পর পুতুল নাম পাল্টে তিনি পরিচিত হন খালেদা জিয়া নামে।

বিয়ের পর স্বামী জিয়াউর রহমানের পোস্টিং এবং চাকরির সুবাদে খালেদা জিয়াকেও বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম পুত্র তারেক রহমানের জন্ম হয়। ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় ও কনিষ্ঠ সন্তান আরাফাত রহমান কোকো জন্ম নেয়। বিয়ের পর ১৯৬৫ সালে তিনি স্বামীর সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে তারা করাচিতে বসবাস করতেন।

একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে তিনি সেখানকার সামাজিক রীতিনীতি এবং শৃঙ্খলার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেন। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তারা করাচিতে বসবাস করেন। করাচির সেই দিনগুলোতে খালেদা জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধূর মতোই সংসার সামলাতেন। জিয়াউর রহমান যেমন সেনাবাহিনীতে তার শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত ছিলেন তেমনি ঘরেও তিনি ছিলেন খুব গোছানো একজন মানুষ। জিয়াউর রহমান তার ব্যস্ত কর্মজীবনের ফাঁকে যতটুকু সময় পেতেন তা স্ত্রী ও সন্তানের সাথেই কাটাতেন।

ঢাকায় ফেরা ও যুদ্ধের দিনগুলো

১৯৬৯ সালে তারা ঢাকায় ফিরে আসেন। কিছুদিন জয়দেবপুরে থাকার পর জিয়াউর রহমানের পোস্টিং হয় চট্টগ্রামে। খালেদা জিয়াও স্বামীর সাথে সেখানে চলে যান। তারা চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাদের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন। সাজানো গোছানো সংসার ছিল তাদের। কিন্তু ১৯৭১ সাল তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন জিয়াউর রহমান ছিলেন মেজর। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

স্বামী যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তিনি একা হয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় চলে আসেন। বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন।

কিন্তু বেশিদিন নিরাপদে থাকতে পারেননি। ২ জুলাই সিদ্ধেশরীতে জনাব এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে পাক সেনারা তাকে দুই ছেলে সহ বন্দী করে। দীর্ঘদিন বন্দি ছিলেন। স্বামীর কোনো খবর না পেয়েও তিনি সন্তানদের আগলে রেখেছিলেন পরম মমতায়। এই সময়টি ছিল তাদের দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন শুরু

১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান। এরপর শুরু হয় তাদের নতুন জীবন। জিয়াউর রহমান তখন দেশের সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এবং পরবর্তীতে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তারা ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়িতে ওঠেন। এই বাড়িটিই ছিল তাদের সুখের নীড়।

খালেদা জিয়া তখন পুরোপুরি একজন গৃহিণী। তিনি নিজের হাতে সংসার সামলাতেন। দুই ছেলে তারেক ও কোকোকে পড়ানো এবং তাদের দেখাশোনা করাই ছিল তার মূল কাজ। তিনি বাগান করতে ভালোবাসতেন। বাড়ির আঙিনায় তিনি নানা ধরনের ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন। রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত বেগম জিয়া একজন সাধারণ গৃহবধু ছিলেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনও রাজনীতিতে বেগম জিয়ার উপস্থিতি ছিল না।

ফার্স্ট লেডি হিসেবে নিভৃত জীবন

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। খালেদা জিয়া হন দেশের ফার্স্ট লেডি বা রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী। কিন্তু তিনি অন্যান্য ফার্স্ট লেডিদের মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও প্রচারবিমুখ। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে তাকে খুব একটা দেখা যেত না। তিনি ক্যামেরার সামনে খুব একটা আসতেন না এবং রাজনীতি নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখাতেন না। জিয়াউর রহমানও চাইতেন না তার স্ত্রী রাজনীতিতে জড়ান।

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরেও জিয়াউর রহমান খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাদের বাসায় বিলাসিতার কোনো ছাপ ছিল না। খালেদা জিয়া নিজে রান্না করতেন এবং অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন। স্বামীর রাজনৈতিক সহকর্মী বা বিদেশি অতিথিরা যখন বাসায় আসতেন তখন খালেদা জিয়া নিজে থেকেই তাদের তদারকি করতেন। তাদের এই সাদামাটা জীবনযাপন তখন অনেকের কাছেই প্রশংসিত ছিল।

স্বামীকে হারিয়ে অথৈ সাগরে

১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া বিধবা হন। তাদের ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে এক ট্র্যাজেডির মাধ্যমে। স্বামীর মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। দুটি ছোট সন্তান নিয়ে তিনি তখন অথৈ সাগরে।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া চেয়েছিলেন সন্তানদের নিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতে। কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধে এবং জিয়াউর রহমানের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। যে নারী কখনো রাজনীতির ছায়া মাড়াননি তিনি হয়ে ওঠেন দলের কাণ্ডারি। স্বামীর রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্যই তিনি রাজনীতির কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন।

বেগম খালেদা জিয়ার দাম্পত্য জীবন ছিল ত্যাগ ও ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি যেমন ছিলেন একজন দায়িত্বশীল সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী তেমনি ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রপতির জীবনসঙ্গী।

স্বামীর মৃত্যুর পরেও তিনি তার স্মৃতি ও আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন। তারেক ও কোকোর মধ্যে তিনি খুঁজে ফিরতেন তার প্রিয় কমলের প্রতিচ্ছবি। রাজনীতির ময়দানে তিনি যতই কঠোর হোন না কেন ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন এক মমতাময়ী মা ও স্ত্রী। তাদের সেই সুখের স্মৃতিগুলোই হয়তো তাকে জীবনের কঠিন সময়গুলোতে পথ চলার শক্তি জুগিয়েছিল।

খালেদা জিয়া এবং জিয়াউর রহমানের দাম্পত্য জীবন ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গভীর বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তারা একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। জিয়াউর রহমানের শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবন এবং খালেদা জিয়ার ধৈর্যের সংমিশ্রণ তাদের সংসারকে একটি আদর্শ রূপ দিয়েছিল। আজও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে পুতুল ও কমলের এই সংসার এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে আছে।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন