বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে একটি উদ্বেগজনক সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসছে। মতাদর্শের দ্বন্দ্ব আর নীতিগত বিতর্কের জায়গা দখল করছে অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ আর ইচ্ছেমতো গালিগালাজ। জেদ আর আক্রোশে একে অপরের প্রতি এই অশোভন বিষোদগার রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদে দেখা যাচ্ছে। অথচ রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল আদর্শ ও দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র। তা না হয়ে ক্রমেই সেটি পরিণত হচ্ছে কাদা ছোড়াছুড়ির এক করুণ মঞ্চে। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতাকেও ক্ষয় করে দিচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা জীব অর্থাৎ মানুষ বানিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। তিনি অনন্য নেয়ামত হিসেবে আমাদেরকে দিয়েছেন– বাকশক্তি ও ভাষাশক্তি। আল্লাহতালার সৃষ্টি ১৮ হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষের পার্থক্যের একটা বড় উপলক্ষ হচ্ছে এই বাকশক্তি বা ভাষাশক্তি। আমরা পড়েছি, মানুষের পরিচয় হচ্ছে বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। এই একটি গুণ দিয়েই অন্যসব প্রাণী থেকে মানুষকে আলাদা করা হয়েছে।
এই দেশ জন্ম নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে, গণতন্ত্রের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। এখানে মতভেদ থাকবে, বিরোধ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক, এটাই কাম্য। ভিন্নমত ছাড়া গণতন্ত্র নিস্তেজ হয়ে যায়। কিন্তু ভিন্নমত আর বিদ্বেষ এক জিনিস নয়। সমালোচনা যদি হয় যুক্তিনির্ভর ও নীতিনিষ্ঠ, তবে তা রাষ্ট্রকে শক্ত ভিত দেয়। আর যখন তা নেমে আসে কুৎসা, অবমাননা ও ব্যক্তিগত আক্রমণে, তখন তা কেবল প্রতিপক্ষকে নয়, পুরো জাতিকেই দুর্বল করে।
আজ যাঁরা ক্ষমতার বাইরে, তাঁরা ক্ষমতাসীনদের ভাষায় আঘাত হানছেন; কাল ক্ষমতায় এলে তাঁদেরই কণ্ঠে শোনা যায় একই কঠোরতা, একই অসহিষ্ণুতা। এই চক্র চলতেই থাকে। প্রতিশোধের রাজনীতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকার হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে রাজনীতির ভেতর জন্ম নেয় বিষাক্ততা, তরুণ সমাজ পায় ভুল শিক্ষা, আর সাধারণ মানুষ রাজনীতির ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ক্রমে উদাসীন হয়ে পড়ে। যেখানে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে বিভাজনের রেখা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
দ্য ট্রায়াল বা দ্য ক্যাসল-এ ফ্রান্ৎস কাফকার বলেছেন– ‘আমলাতন্ত্র প্রথমে মানুষের ওপর আঘাত করে না, আঘাত করে ভাষার মাধ্যমে। ভাষার এই অবক্ষয় শুধু শব্দের সীমায় আটকে থাকে না; এর প্রভাব পড়ে আচরণে, নীতিনির্ধারণে, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনেও। উন্নয়ন, সুশাসন আর নৈতিক নেতৃত্বের বদলে প্রাধান্য পায় প্রতিহিংসা ও অপসংস্কৃতি। গণতন্ত্র তখন আর জনকল্যাণের বাহন থাকে না; তা পরিণত হয় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার নির্মম খেলায়। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা রাষ্ট্রকে ঠেলে দেয় অবিশ্বাস, সংঘাত আর অনিশ্চয়তার পথে। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন (তরজমা) ‘এবং তোমরা একে অপরের গীবত করবে না: (সূরা হুজুরাত ৪৯:১২)। আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ইরশাদ করেছেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করে না। তাকে অপমান করে না এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না। (সহীহ মুসলিম ২৫৬৪)। অথচ আমাদের দেশে রাজনীতির মানুষরা একে অপরকে আঘাত করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ভাষাকে ব্যবহার করছে।
তাই এমন বাস্তবতায় সময়ের দাবি স্পষ্ট– রাজনৈতিক দল, নেতা এবং কর্মীদের ভাষা ও আচরণে সংযম আনতেই হবে। মতভেদ থাকুক, কিন্তু শালীনতার সীমা অটুট থাকুক। বিতর্ক হোক তথ্যভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর ও নীতিসম্মত। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। কারণ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের গুরুদায়িত্ব। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র কল্পনাও করা যায় না। সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার চর্চা— এই গুণগুলোই রাজনীতিকে মহৎ করে তোলে। গালিগালাজের রাজনীতি আমাদের কোথাও নিয়ে যাবে না; বরং তা আমাদের নিজেদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই প্রয়োজন নতুন করে ভাবার, নতুন করে বলার, এবং সবচেয়ে জরুরি—নতুন করে শোনার। তবেই বাংলাদেশ এগোতে পারবে স্থিতিশীলতা, সম্মান ও মর্যাদার পথে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সাবেক কর্মকর্তা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ।

মুস্তাফিজুর রহমান পাটোয়ারী