প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬ । ১০:১৪ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

অনুমতি ছাড়াই মতলবে চলছে ‘সোলেমান লেংটার মেলা’, বসছে গাঁজার আসর

অনলাইন ডেস্ক

প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বেলতলী এলাকার বদরপুরে শুরু হচ্ছে সোলেমান লেংটার মেলা।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) থেকে ৭ দিনব্যাপী এ মেলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও বরাবরের মতো এবারও ভক্তদের আগাম উপস্থিতির কারণে মেলার নির্ধারিত তারিখের একদিন আগেই সোমবার (৩০ মার্চ) থেকেই শুরু হয়ে গেছে বদরপুরের লেংটার মেলা।

অন্যান্য বছরের হিসেব অনুযায়ী ৭ দিনের এই মেলায় ১৫ লাখের বেশি লোকের সমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বিগত বছরগুলিতে এই মেলায় অন্তত ২ সহস্রাধিক গাঁজার দোকান বসেছে এবং এবারও ঝুঁপড়ির মতো বানিয়ে ব্যাপক হারে গাঁজার দোকান বসতে শুরু করেছে।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন হলেও এ বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায় না বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকার কয়েকজন।

এদিকে মেলা কর্তৃপক্ষের প্রধান লাল মিয়া বলেন, লেংটা বাবার ভক্ত-পাগলরা মাদক সেবনের জন্য যেই আস্তানা বা দোকানগুলো বসান সেগুলি মাদক বিক্রির দোকান হিসেবে চিহ্নিত হবে না।

এই মেলায় কোনো ধরনের ইজারা না থাকা সত্ত্বেও বিগত সময়ে মেলার ৭ দিনে নদীপথে প্রতিদিনে শত শত ট্রলার ও লঞ্চগুলো নদীর তীরবর্তী ১ থেকে দেড় কিলোমিটার অঞ্চলে যাত্রী নামানোর যাত্রী ও ঐসব নৌযান থেকে নদীরপাড়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। সড়কপথে আসা বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থেকেও প্রকাশ্যেই চলেছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। এছাড়া মেলায় থাকে হরেক রকমের জুয়ার আয়োজন। এবারেও তার পূনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় লোকজন ।

এই মেলার আগমুহূর্তে আইন শৃঙ্খলা সভায় এখানে মাদকের দোকান বসানো, মাদক কেনাবেচা ও সেবন, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন রকমের জুয়া, অশ্লীল নৃত্য, চুরি-ছিনতাই, পকেটমারিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও বিগত সময়ে তা মোটেও মানা না হওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় মতলববাসীর মধ্যে। অনুমোদন না পাওয়ায় যদিও এখন পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে মেলা বা ওরস কর্তৃপক্ষের আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো সভাই হয়নি।

এদিকে ইতোমধ্যেই মাজার এলাকায় ভক্তদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। তবে এই মেলাকে কেন্দ্র করে মাদকের মেলা বা মাদকের জমজমাট হাট এবং নানা রকমের জুয়ার আসর বসার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা।

লেংটার মেলা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেলতলী লঞ্চঘাট থেকে সাদুল্ল্যাপুর মোড় পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এলাকার চারপাশ জুড়ে মেলার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন । দোকানপাট সংস্কার, অস্থায়ী স্টল নির্মাণ ও ভক্তদের আস্তানা গড়ে তোলার কাজও শেষে হওয়ার পথে। সোলেমান লেংটার মাজারের আশপাশে তার সাগরেদদের অন্তত ১৮ থেকে ২০টি মাজারও চলেছে ধোয়া-মোছার কাজ। লেংটার মাজারের কাছাকাছি ও আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ২ শতাধিক খানকাও রয়েছে।

স্থানীয় বিভিন্ন পেশার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই খানকাগুলোর বেশীরভাগ খানকাতেই বিগত সময়ে গানের তালে তালে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের অশ্লীল নৃত্যের ঘটনা ঘটেছে।

তারা আরও জানান, শুধু এই খানকাগুলোতেই নয় আশপাশ অঞ্চলে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই ব্যাপক হারে অশ্লীল নৃত্য ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে আসছে। দেখা গেছে, মাজারের পিছনের বা পশ্চিমপাশে অন্তত ১০/১২টি পুকুরের পাড়গুলো ও ইট সোলিং রাস্তার পাশে (গোরস্তান সংলগ্ন) মোল্লাকান্দির বিভিন্ন গাছের বাগানগুলোতে ঝুঁপড়ির মতো আস্তানা গেড়ে বসতে শুরু করেছে গাঁজার দোকানগুলো। ইতোমধ্যেই ওখানে কিছু ক্রেতা-সেবনকারীর উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে।

গাঁজার দোকানদার হিসেবে পুরুষদের পাশাপাশি নারী বিক্রেতাদেরকেও দেখা গেছে। এই মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেশাগ্রস্তদের সমাগম ঘটে। এই মেলা সারা দেশের মাদকসেবীদের একটা মিলনমেলায় পরিণত হয় বলেও স্থানীয়দের কাছে জানা গেছে।

সোলেমান নেংটা মেলার আয়োজক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পীর ও সাধক হযরত শাহ সুফি সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবা বাংলা ১৩২৫ সালের চৈত্র মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর থেকেই প্রতি বছর তার মাজারকে কেন্দ্র করে চৈত্রের ১৭ তারিখে ওরস ও মেলার আয়োজন করা হয়। ‘লেংটার মেলা’ নামে পরিচিত এ আয়োজনে প্রতিবছর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখের বেশি লোক সমাগম ঘটে। ১৭ চৈত্র, ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার থেকে মেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভক্তদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে একদিন আগ থেকেই মেলার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে।

চট্টগ্রামে বালতির পানিতে পড়ে ব্যাংক কর্মকর্তার ছেলের মৃত্যু এই মেলা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে হওয়ায় নৌপথে মেঘনা ও ধনাগোদা নদী দিয়ে লাল রঙের পতাকাসহ নানা রঙের সাজসজ্জা করে ৭ দিনের প্রতিদিনই শত শত ট্রলার ও লঞ্চ মেলা এলাকায় আসে। মেলার এই ৭ দিন পুরো নদী এলাকায় যেন একটি অন্যরকম সাজে সজ্জিত থাকে। স্থানীয়দের মধ্যেও অন্যরকম আমেজ দেখা যায়।

মতলব উত্তর উপজেলা পরিষদ মসজিদের খতিব মাওলানা এনামুল হকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, মাদক, নারী-পুরুষের বেহায়াপনা-অশ্লীলতা- ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে ইসলাম পরিপন্থি কার্যক্রম পরিহার করা উচিত।

মেলায় ব্যাপক গাঁজার দোকান কেন বসে জানতে চাইলে সোলেমান শাহ (রহ.) এর মাজারের খাদেম মতিউর রহমান লাল মিয়া বলেন, যেসব এলাকায় এগুলো বসে ওই জায়গাগুলো আমার নিয়ন্ত্রণাধীন না। তাই আমি এগুলো বন্ধ করতে পারছি না। তবে ল্যাংটার ভক্তদের মাদক সেবনের আস্তানাগুলোকে গাঁজার দোকান বলা যায় না।

নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে রিজার্ভ ট্রলার-লঞ্চের যাত্রীদের তীরে নামার পর ব্যাপক চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, যারা লঞ্চঘাট ইজারা আনে এইটা তাদের বিষয়ে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে আমরাও চাই এই লেংটার মেলা বা ওরসকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈতিক কাজ না হোক। এ বিষয়ে আমি সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, মেলার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পোশাকধারী অর্ধশত পুলিশ সদস্য এবং সিভিল পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যই এখানে কাজ করবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, মতলবের সোলেমান লেংটার মেলা অনেক বড় এবং বিশাল আকৃতির মেলা। জেলা প্রশাসন থেকে এখনও এই মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদন পেলে এই মেলার শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা সভা হবে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে ভূমিকা রাখা হবে।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন