ঠিকাদারের গাফিলতিতে দেড় বছর ধরে পড়ে আছে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের লাওকোরা মুক্তিযোদ্ধা পাকা সড়কের সংস্কার কাজ। সড়কটিতে চলাচলে দুর্ভোগে চরম ভোগান্তির শিকার তিন উপজেলার প্রায় ১৫ গ্রামের বাসিন্দারা।
কাজটি দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার তাগিদ দেয়া হয়। কোন কর্ণপাত না করায় ইতোমধ্যে ব্যাংকে সিকিউরিটি জব্দের চিঠি দিয়েছে জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী বিভাগ।
চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কের উয়ারুক স্টেশন থেকে লাওকোরা বটতলী এলাকার সাড়ে ৫ কিলোমিটারজুড়ে লাওকোরা মুক্তিযোদ্ধা সড়ক। জেলার হাজীগঞ্জ-কচুয়া-শাহরাস্তি উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রায় দুই লাখ মানুষের যাতায়াতের প্রধান সড়ক এটি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেড় কোটি টাকায় সড়ক সংস্কার কাজটি পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আইভি ওয়াই কনেস্ট্রাকশন। পরে কাজটি ভায়া হিসেবে নেন আরেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আফজাল ট্রের্ডাসের স্বত্তাধিকারী আফজাল হোসেন।
পাকা করণের উদ্দেশ্যে প্রথমেই সড়কের মেগাডম করলেও দেড় বছরে শুরু করেনি পিচ-ঢালাইয়ের কাজ। এতে সড়কে ইটের গুড়ো ও বালু উড়ে চরম দুভোর্গে বাড়ী ফেরা মানুষ, পথচারী, শিক্ষার্থী ও যানবাহনগুলো। জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গরা একাধিকবার ঠিকাদার ও প্রশাসনের কাছের স্বরণাপন্ন হলেও শুরু হচ্ছে না সড়ক সংস্কারের কাজটি।
লাওকোরা গ্রামের ইউপি সদস্য রহমত উল্ল্যাহ বলেন, ‘রাস্তাটাতো আমাদের অতিব জরুরী। এই রাস্তা আজ দীর্ঘদিন প্রায় দীর্ঘ ১ বছর আগ থেকে এ রাস্তাটা কিন্তু উল্টায়া রাখছে কন্ট্রাক্টর-ঠিকাদার। আমরা তার সাথে মুঠোফোনে কয়েকবার আলোচনা করেছি। আমাদের সাথে কয়েকবার কমিটমেন্ট করছে। চাঁদপুর জেলা এবং হাজীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যেনো এই কাজটি অতি দ্রুত সম্ভব- যেভাবে হোক সমাধান করে দেয়। ’
হাটিলা টঙ্গিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা বাবলু পাটোয়ারী বলেন, এমন একটা কন্ট্রাক্টর কাজটা নিয়েছে খুব খারাপ একজন কন্ট্রাক্টর। যে আজকা দেড় বছর আগে এই রাস্তাটা উল্টো করে রাখছে। জনগণের ভোগান্তির শেষ নাই। এবং জনগণকে এতো কষ্ট দিতেছে- এতো করে তাকে রিকুয়েস্ট করতেছি- বার বার সময় বাড়াইতেছে, জনগণকে জনগণের চলাচলের পথ এতো বাজে অবস্থা করছে- মানুষ খুব কষ্ট পায়। সে কোনো অবস্থাতে কথা শুনতেছে না।
অটোরিকশা চালক ইব্রাহীম বলেন, ‘এখান থেকে স্টেশনে আপ-ডাউন করলে কাপড়-চোপড় পুরো নোংড়া হয়ে যায়। আবার ধোয়া লাগে, না-হয় এসব গায়ে দেওয়া যায় না। পুরা দেখেন- এই রাস্তা ঘাটে, এই দোকান পাট- সব লাল হয়ে গেছে। বাড়ি-ঘর সব লাল হয়ে গেছে- এই রাস্তার বালু চালু গিয়ে।’
সিএনজি চালক নবীর হোসেন বলেন, ‘রাস্তাটা উল্টানোর পর বলছিলো কিছুদিন পর কাজ করবে। কিন্তু কাজটা করেনি। না করাতে রাস্তার কারণে গাড়িগুলো ভেঙে যায়। আমরা চলতেও কষ্ট, কিন্তু পাশে যারা আছে চায়ের দোকান, পান দোকান প্রচুর ক্ষতি হইতেছে। এবং টিনের ঘর-দুয়ার সব লাল হয়ে যাইতেছে। ’
এই সড়কে সিএনজি, অটোরিক্সা, পিকআপ, ট্রাক্টর ও ট্রাকসহ প্রতিনিধি ৫ শতাধিক যানবাহন চলাচল করে। সড়কে চালচালকারীরা ধুলোবালুতে শ্বাসকষ্টসহ নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। দ্রুত সড়কটি পাকাকরণের দাবী ভুক্তভোগীদের।
সিএনজি চালক সুমন গাজী বলেন, ‘অটোগুলো চলতে পারে না। মানুষের শ্বাসকষ্ট সমস্যা হয়। এই রাস্তা আজকে প্রায় অনেক মাস যাবত নষ্ট করে পেলে রাখছে কাজ করেনা, উল্টাইয়া পালাই রাখছে। আমরা যারা সাধারণ যাত্রী আছি- এই রাস্তা আমাদের জন্য বিপদজনক। বিশেষ করে যারা অসুস্থ বা গর্ভবতী মহিলা যারা তাদের বেশি সমস্যা। আসলে এই রাস্তাটা যদি উন্নয়ন হয়, কাজ যদি হয়- আমাদের জন্য বেশি সুযোগ-সুবিধা হবে।’
সিএনজির যাত্রী কাউছার হোসেন বলেন, ‘এই রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। এখন মানুষের দুর্ভোগ জনজীবন বিপর্যস্ত। এগুলো কমাতে রাস্তাটা দ্রুত মেরামত করা দরকার।’
শিক্ষক ফারাজ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘গাড়ি থেকে ১০ হাত দূরে কিছুই দেখা যায় না। রাস্তার কার্ফিটিং নাই, এখানে ধুলাবালি জনসাধারণের বিশাল জন দুর্ভোগ হচ্ছে। এবং বাচ্চা থেকে শুরু করে সর্ব শ্রেনীর লোকজন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
এদিকে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে সড়কটি কার্পেটিংয়ের কাজ করার আশ্বাস দেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. আফজাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই যে ৫ কিলো রাস্তা। এই রাস্তাটা বেহাল অবস্থা ছিলো- আমরা একটা পার্শে¦ কাজ করছি ডব্লিউবিএম পর্যন্ত। আগামী দুই/ এক মাসের মধ্যে ইনশাআল্লাহ কার্পেটিং করে কাজটা সমাপ্ত করে দেওয়া হবে।’
ইতোমধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে একাধিবার চিঠি দিয়ে হুঁশিয়ারীর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা বাবদ- ব্যাংকের সিকিউরিটি জব্দ রাখার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। জুনের মধ্যে কাজ না করলে জরিমানা আদায় করে নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির সংস্কার কাজ করা হবে বলে জানান এলজিইডি সহকারী প্রকৌশলী মো. তাহসিনুল হোসেন মুকুল।
তিনি বলেন, ‘ কাজটা আসলে ২০২৪-২০২৫ সালে জেবু মেন্টিনেন্স থেকে করা হয়েছিল। এবং ওয়ার্ক অর্ডাও দেয়া হইছে। আইভি কনেস্ট্রাকশন একটা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন যাবত কাজটা ফেলে রাখছে। অফিসে অনেক অভিযোগও আছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে আমরা বার বার চিঠি দিয়েছি। এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকে ফারফারেন্স সিকিউরিটি জমা দিয়েছে, সেখানকার হ্যান্ড ক্যাশ করার জন্য আমরা ব্যাংকে চিঠি দিয়েছি। ব্যাংক থেকে এখনও হ্যান্ড ক্যাশ পাইনি।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করার প্রক্রিয়া চলছে এবং জরিমানা করার পর পেমেন্ট সেটেল্ড হলে আমার নতুন করে পুনরায় কাজটি টেন্ডার করা যাবে।’
২০২৫ সালের নভেম্বরে কাজটির মেয়াদ কাগজে-কলমে শেষ হলেও বর্ষার আগে জনস্বার্থে দ্রুত পাকাকরণের দাবী সড়কে চলাচলকারী প্রায় দুই লাখ মানুষের।

নিজস্ব প্রতিনিধি