প্রকাশের সময়: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ । ৯:৩০ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রধান শিক্ষককে জুতা নিক্ষেপের চেষ্টা: শাস্তির বদলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব!

এস এম ইকবাল
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান ও জুতা নিক্ষেপের চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত এক সহকারী শিক্ষিকাকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনায় শিক্ষক মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার রুস্তমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ফারহানা জাহান নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৮ মে ২০২৫ তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় হাজিরা খাতায় নিয়ম অনুযায়ী অনুপস্থিতির সংকেত দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান।
পরবর্তীতে ১২ মে বিদ্যালয়ে এসে নিজের হাজিরা খাতায় লাল কালির সংকেত দেখতে পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ফারহানা জাহান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। তার চিৎকারে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, একপর্যায়ে তিনি প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ করে বলেন, “তুই আমার হাজিরায় হাত দেওয়ার কে? কেন হাত দিলি? এত সাহস কোথায় পেলি? তোকে দেখে ছাড়ব।” স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিওতেও তাকে জুতা হাতে নিয়ে প্রধান শিক্ষকের দিকে তেড়ে যেতে দেখা যায়।
ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আফতাবুল ইসলাম ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিরিন সুলতানার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর ফারহানা জাহানকে কমলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়।
অভিযোগের তদন্ত শেষে সহকারী শিক্ষিকা ফারহানা জাহানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং ২৮ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পদায়ন নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ১৯৮৯ সালে চাকরিতে যোগদানকারী বিল্লাল হোসেন এবং ১৯৯৬ সালে যোগদানকারী ফাতেমা বেগমের মতো জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের উপেক্ষা করে ১৫ জুন ২০০৩ সালে চাকরিতে যোগদানকারী ফারহানা জাহানকে দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত একজন শিক্ষিকা কীভাবে শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতিসদৃশ দায়িত্ব পেলেন।
এদিকে গত ৫ মে ২০২৬ দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ফারহানা জাহানকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। ওই সময় একটি শ্রেণিকক্ষে সহকারী শিক্ষিকা ফাতেমা আক্তারের পরিবর্তে তার সদ্য দাখিল পাস করা ছেলেকে পাঠদান করতে দেখা যায়। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে ফাতেমা আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, অসদাচরণ এবং নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও ফারহানা জাহানের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তার প্রভাব ও ক্ষমতার উৎস নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রুস্তমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, “আমি আমার কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে। ১২ মে’র সেই ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনও নিজেকে অসহায় মনে হয়। কোনো শিক্ষক যেন এ ধরনের অপমানের শিকার না হন। কী দোষ ছিল আমার, কেন এত মানুষের সামনে আমাকে অপমান করা হলো—সেই প্রশ্নের উত্তর আজও পাইনি। শেষ বিচারের মালিক আল্লাহ।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহানা জাহান বলেন, “আপনারা যা ইচ্ছা লেখেন, যা পারেন করেন।”
জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. গিয়াস কবির বলেন, “তিনি যে আচরণ করেছেন, তাতে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল।”
এ বিষয়ে তৎকালীন ও বর্তমান ক্লাস্টার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা এবং তদন্ত কমিটির সদস্য আফতাবুল ইসলাম বলেন, “তদন্তে ফারহানা জাহানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছি। তবে কোন প্রক্রিয়ায় তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিরিন সুলতানা বলেন, “সহকারী শিক্ষিকা ফারহানা জাহান অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অন্যায় করেছেন।”
তাকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের ডিঙিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে উপেক্ষা করে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
এ ঘটনায় শিক্ষকদের একটি অংশ দোষী সাব্যস্ত একজন শিক্ষিকাকে শাস্তির পরিবর্তে দায়িত্ব প্রদান এবং পদায়ন নীতিমালা অনুসরণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন