শাহরাস্তিতে প্রথমে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে প্রচার পাওয়া গৃহবধূ রিগান আক্তার মিম (২৬) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশ।
ঘটনার মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করে নিহতের দেবরের স্ত্রী কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা (২৩)-কে গ্রেপ্তার করে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তিনি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নিজের বড় ভাসুরের স্ত্রী (জ্যা) রিগান আক্তার মিমকে গলাটিপে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পারিবারিক ঈর্ষা ও দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার দিবাগত রাতে শাহরাস্তি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বার্ত্তলা মহল্লার বেপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মিম মৃত সেলিম বেপারীর ছেলে সাইফুল আলম রনির স্ত্রী। তিনি আড়াই বছর বয়সী কন্যা সাইফা ও চার মাস বয়সী ছেলে সিরাজের জননী। ঘটনার সময় বাড়িতে দুই গৃহবধূ, পরিবারের প্রবীণ সদস্য সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এবং তিনটি শিশু ছিল।
ঘটনার পর কাজী সুমাইয়া নিজেই ডাকাতির নাটক সাজিয়ে নিজেকে আহত দাবি করেন এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হামলার বর্ণনা দেন। কিন্তু ঘটনাস্থলের আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তার বক্তব্যের অসঙ্গতি বিশ্লেষণ করে পুলিশের তদন্তকারী দল দ্রুত হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। পরে নিবিড়ভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার বর্ণনা দেন এবং আদালতেও একই বক্তব্য প্রদান করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ক্রাইম সিন সংরক্ষণ, আলামত সংগ্রহ এবং রহস্য উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ সুপারের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে সহকারী পুলিশ সুপার (কচুয়া সার্কেল) মো. আব্দুল হাই চৌধুরী, শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ পুলিশের একটি চৌকস টিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করে।
ঘটনার রাতে প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনে ছুটে এসে মিমকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। তার গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবর পেয়ে নিহতের স্বজনরা ছুটে এলে দুই শিশু সন্তানকে ঘিরে তাদের আহাজারিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতের স্বামী সাইফুল আলম রনি শুরু থেকেই সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
বৃহস্পতিবার রাতে গণমাধ্যমকে শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঘটনার পরপরই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় একটি বিশেষ টিম গঠন করে ঘটনাস্থলের আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। ডাকাতির গল্প সাজিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে।
আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এনে দিয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. কবির হোসেন বাদী হয়ে শাহরাস্তি মডেল থানায় মামলা নং-২৫, তারিখ ১৫ জুলাই ২০২৬, পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে পুলিশ।
এদিকে, মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের পর নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশের তৎপরতা ও পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তাদের ধন্যবাদ জানান এবং এ তদন্তকে দৃষ্টান্তমূলক বলে অভিহিত করেন।

মো. মাসুদ রানা