প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১০:১৯ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারি টাকায় রাস্তা, নামফলকে নিজের নাম—জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার নাসিরকে ঘিরে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিনিধি
সরকারি অর্থায়নে নির্মিত রাস্তার নামফলকে নিজের নাম বসিয়ে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুর জেলা পরিষদের এক সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, যে প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির অর্থায়ন করেছে, ওই প্রতিষ্ঠানেরই কর্মরত সার্ভেয়ার মো. নাসির উদ্দিন নিজের বাড়ির এলাকায় নেওয়া প্রকল্পের নামফলকে লিখিয়েছেন—‘সহযোগিতায় মোঃ নাসির উদ্দিন’।
চাঁদপুর জেলা পরিষদের অর্থায়নে ফরিদগঞ্জ উপজেলার সরখাল গ্রামের ভদ্রবাড়ি এলাকায় ‘সরখাল ওয়াপদা সংলগ্ন মসজিদ ও কবরস্থানের রাস্তা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় সিসি ঢালাই রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় তিন লাখ টাকা।
প্রকল্পের নামফলকে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ‘অর্থায়ন: জেলা পরিষদ, চাঁদপুর’। অর্থাৎ রাস্তা নির্মাণে ব্যবহৃত অর্থ এসেছে জেলা পরিষদের সরকারি বরাদ্দ থেকে। কিন্তু একই নামফলকে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—‘সহযোগিতায় মোঃ নাসির উদ্দিন’।
আর এই নাসির উদ্দিনই চাঁদপুর জেলা পরিষদের একজন কর্মরত সার্ভেয়ার। প্রকল্পটি আবার বাস্তবায়িত হয়েছে তাঁর নিজের বাড়ির এলাকা সরখাল গ্রামের ভদ্রবাড়িতে।
বিষয়টি নিয়ে নাসির উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রকল্পটি নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আমি আবেদন করেছি। আমি প্রকল্পটা নিয়ে দিয়েছি। সমস্ত কিছু আমি করেছি। সেজন্য সহযোগিতায় আমার নাম লিখে দিয়েছি। তাতে সমস্যা কী হয়েছে?”
নাসির উদ্দিনের এই বক্তব্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি অর্থে একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পর সেই প্রকল্পের নামফলকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই একজন কর্মচারী কীভাবে নিজের ব্যক্তিগত নাম ‘সহযোগিতায়’ হিসেবে ব্যবহার করেন?
কারণ প্রকল্পটির অর্থ জেলা পরিষদের। কাজটিও জেলা পরিষদের প্রকল্পের আওতায়। অথচ নামফলকে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে একজন কর্মচারীর নাম যুক্ত হয়েছে। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর কৃতিত্ব ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আরও প্রশ্ন হচ্ছে, ‘সহযোগিতা’ বলতে নাসির উদ্দিন আসলে কী করেছেন? তিনি কি প্রকল্পে ব্যক্তিগত অর্থ দিয়েছেন? জমি দিয়েছেন? শ্রম বা নির্মাণসামগ্রী দিয়েছেন? নাকি জেলা পরিষদের একজন কর্মচারী হিসেবে প্রকল্পটি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে দাপ্তরিক ভূমিকা পালন করেছেন? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
যদি প্রকল্পের তিন লাখ টাকাই জেলা পরিষদের সরকারি বরাদ্দ থেকে ব্যয় হয়ে থাকে এবং নাসির উদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে কোনো অর্থ বা সম্পদ প্রদান না করে থাকেন, তাহলে সরকারি অর্থে নির্মিত রাস্তার নামফলকে তাঁর ব্যক্তিগত নাম ব্যবহারের বিষয়টি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের নামফলকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত নাম এভাবে ব্যবহার করা বেমানান। এটি সরকারি প্রকল্পের স্বাভাবিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং নীতিগতভাবেও বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি অর্থায়নে যে কাজ হয়েছে, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও নাম প্রচার করার বিষয়টি ঠিক হয়নি। একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী হলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত ছিল। এটি নীতিবহির্ভূত কাজ হয়েছে বলেই মনে হয়।”
এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে স্বার্থের সংঘাত ও সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগত কৃতিত্ব জাহিরের বিষয়টি নিয়ে। কারণ নাসির উদ্দিন শুধু প্রকল্প এলাকার বাসিন্দাই নন; তিনি জেলা পরিষদেরই একজন কর্মরত সার্ভেয়ার। একই প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে নিজের বাড়ির এলাকায় প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া এবং পরে সেই সরকারি প্রকল্পের নামফলকে নিজের নাম যুক্ত করা—দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি অর্থে নির্মিত একটি রাস্তা জনগণের সম্পদ। সেখানে অর্থায়ন করেছে জেলা পরিষদ। ফলে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকল্পটি নিজের উদ্যোগে আনলেও সেটি ব্যক্তিগত অর্থে নির্মিত প্রকল্পে পরিণত হয় না। তাই সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর নামফলকে ব্যক্তিগত নাম যুক্ত করে নিজের কৃতিত্ব প্রদর্শনের সুযোগ কতটা বিধিসম্মত ও নীতিসঙ্গত, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
এখন দেখার বিষয়, জেলা পরিষদের অর্থায়নে নিজের বাড়ির এলাকায় নেওয়া এই প্রকল্পে সার্ভেয়ার নাসির উদ্দিনের ভূমিকা কতটুকু ছিল, ‘সহযোগিতায়’ তাঁর নাম লেখার অনুমোদন কে দিয়েছেন এবং সরকারি অর্থে নির্মিত প্রকল্পে ব্যক্তিগত নাম ব্যবহারের কোনো বিধিসম্মত ভিত্তি রয়েছে কি না।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন