প্রকাশের সময়: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৯:৪৪ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

সার্ভেয়ার নাছিরের বদলির একদিন পরই বাতিলের তদবির, জেলা পরিষদের চিঠিতে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিনিধি

চাঁদপুর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও সরকারি প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তাকে নোয়াখালী জেলা পরিষদে বদলি করা হয়েছে। তবে বদলির আদেশের মাত্র একদিন পরই তাকে চাঁদপুরে বহাল রাখার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দিয়েছে চাঁদপুর জেলা পরিষদ। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর নাছির উদ্দিনকে ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগের পর বদলি, আর বদলির পরদিনই বাতিলের তদবির—এমন ঘটনায় চাঁদপুরজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে বদলির আদেশের মাত্র একদিনের মধ্যে তা বাতিলের জন্য চিঠি দেওয়ার বিষয়টি শহর ও জেলার বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০ সেপ্টেম্বরের অফিস আদেশে চাঁদপুর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনকে নোয়াখালী জেলা পরিষদে বদলি করা হয়। একই আদেশে দিনাজপুর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার মোহাম্মদ এমরান হোসেনকে চাঁদপুর জেলা পরিষদে পদায়ন করা হয়েছে।

অফিস আদেশ অনুযায়ী নাছির উদ্দিনকে চাঁদপুর থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু এর একদিন পরই তাকে চাঁদপুরে বহাল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২১ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. কবির হোসেন সরদার স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর একটি চিঠি দেন। চিঠিতে নাছির উদ্দিনের নোয়াখালী জেলা পরিষদে বদলির আদেশ বাতিল করে তাকে চাঁদপুর জেলা পরিষদে বহাল রাখার অনুরোধ জানানো হয়।

চিঠিতে বলা হয়, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা, সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা নিরসনে নাছির উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাকে বদলি করা হলে জেলা পরিষদের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি-সংক্রান্ত কাজে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

তবে নানা অভিযোগ নিয়ে আলোচনায় থাকা একজন কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ দেওয়ার পর মাত্র একদিনের মধ্যেই কেন তাকে একই কর্মস্থলে বহাল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলো—এ প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

বদলির আদেশের পর এত দ্রুত তা বাতিলের জন্য চিঠি দেওয়ার ঘটনায় চাঁদপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও নানা আলোচনা চলছে। অনেকে বিষয়টিকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদলের বাইরে গিয়ে দেখছেন। যদিও বদলি বাতিলের আবেদনের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।

২০১২ সালে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। বর্তমানে তিনি চাঁদপুর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার। চাকরির এক যুগের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠার অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে তার বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং সরকারি দায়িত্বের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফরিদগঞ্জ উপজেলার সরখাল গ্রামে নাছির উদ্দিন একটি দৃষ্টিনন্দন দুইতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বাড়ির আশপাশে রয়েছে জমি ও বড় একটি মাছের দীঘি। স্থানীয়দের দাবি, এসব দৃশ্যমান স্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা।

এ ছাড়া চান্দ্রা বাজারে তার নামে থাকা একটি দোকান জুলাই বিপ্লবের পর হাতবদল হয়েছে বলেও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে জেলা পরিষদের আওতাধীন বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও স্থাপনা থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়াই টাকা নেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাবুরহাটের ব্যবসায়ী কবির মিজির অভিযোগ, সার্ভেয়ার নাছির উদ্দিন প্রত্যেক বছর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিতেন। টাকা না দিলে লিজ বাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হতো বলেও দাবি করেন তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নাছির উদ্দিন এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সরকারি পদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ পাওয়া একটি রাস্তার নেমপ্লেটে নিজের নাম ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে সমালোচনা হয়েছে।

নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তার সরকারি চাকরির বৈধ আয় ও দৃশ্যমান সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন।

স্থানীয়দের দাবি, তার সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। এদিকে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে করা একটি অভিযোগ তদন্তের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে চাঁদপুর জেলা পরিষদের তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে ওই অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি বা ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে একদিকে নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও সরকারি প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ; অন্যদিকে এসব অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তার বদলি এবং বদলির মাত্র একদিনের মধ্যে সেই আদেশ বাতিলের জন্য জেলা পরিষদের চিঠি—পুরো বিষয়টি এখন চাঁদপুরজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষ করে বদলির আদেশের পরদিনই বাতিলের তদবির কেন, এবং অভিযোগের মধ্যে থাকা একজন কর্মকর্তাকে চাঁদপুরে বহাল রাখার প্রয়োজনীয়তা এত জরুরি হয়ে উঠল কেন—এ প্রশ্নের উত্তরই এখন জানতে চাইছেন অনেকে।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন