চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সাচার জগন্নাথ ধাম ও সাংস্কৃতিক সংঘের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এক পক্ষের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করে নতুন কমিটি ঘোষণা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সাচার জগন্নাথ ধাম পূজা ও সাংস্কৃতিক সংঘের পূর্ববর্তী কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বরং সংঘের সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসু আগের ২১ সদস্যের কার্যকরী কমিটি বিলুপ্ত না করেই আবার নিজেকে সভাপতি ঘোষণা করে নতুন করে ২১ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করেন।
তাদের অভিযোগ, সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন কমিটি গঠনের আগে কার্যকরী পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করতে হবে। পরবর্তীতে সেই আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কার্যকরী কমিটির মাত্র চার-পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনায় বিষয়টি নিয়ে সনাতন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে বটু কৃষ্ণ বসু ঘোষিত কমিটির তালিকা নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ঢাকার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
স্থানীয় সংসদ সদস্য বিষয়টি দেখার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত রায়কে নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে। এরপর পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ইউএনও দুই দফা সাচার জগন্নাথ ধাম পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের আশ্বাস দেন। বিশেষ করে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি গঠনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অধিকাংশ সদস্য ঘোষিত কমিটির বিরোধিতা করলেও ইউএনওর আশ্বাসে তারা তখন বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো কঠোর অবস্থান নেননি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইউএনও জানান, শিক্ষামন্ত্রী চীন সফর শেষে দেশে ফিরলে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী দেশে ফিরলে বটু কৃষ্ণ বসু তাঁর ঘোষিত কমিটির কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে আবারও মন্ত্রীর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে মন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তোলার পর কচুয়ায় ফিরে ওই কমিটির পরিচিতি সভা আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে কমিটিতে স্থান না পাওয়া ও বিরোধিতাকারী সদস্যদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পরে বঞ্চিত ও বিরোধিতাকারী সদস্যরা সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সংগঠনের নেতারা বিষয়টি নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের দাবি, এ সময় ইউএনও আগের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে স্পষ্টভাবে জানান, মন্দিরের কমিটি গঠন করা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না; বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
এ অবস্থায় সংগঠনের নেতৃবৃন্দের একটি অংশ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে সেখান থেকেও বিরোধের দৃশ্যমান কোনো সমাধান হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ঘোষিত কমিটিই বহাল থাকার আশঙ্কা করছেন বিরোধিতাকারী সদস্যরা।
এদিকে বটু কৃষ্ণ বসুর নেতৃত্ব ও দীর্ঘ সময় ধরে সভাপতির দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংগঠনের একাংশ। তাদের দাবি, ২০১৯ সাল থেকে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের স্বাক্ষরযুক্ত কমিটির মাধ্যমে তিনি দুই মেয়াদে ছয় বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য সেলিম মাহমুদের স্বাক্ষরযুক্ত কমিটির মাধ্যমে আরও দুই বছর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে তারা দাবি করেন। এরপর সরকার পরিবর্তনের পর শিক্ষামন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে আবারও সভাপতি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ নিয়ে সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বলতে শোনা যায় এত বছর আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে এখন ভোল পাল্টিয়ে বিএনপি সেজেছে। এই দ্বিমুখী চরিত্র হীন বসু কৃষ্ণ বসুর মুখোশ উন্মোচন সময় এসেছে।
সাচার জগন্নাথ ধাম মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব সাহা বলেন, “আমি বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক। আমাকে না জানিয়ে জগন্নাথ ধাম কমিটি বিলুপ্ত করে সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসু নিজেকে সভাপতি ঘোষণা করেছেন। এরপর তিনি ২১ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে প্রচলিত গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণে বিষয়টি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় সমাধানের দাবি জানান তিনি।
নতুন কমিটি গঠন ও অভিযোগের বিষয়ে সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসুর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত রায় বলেন, “সাচার জগন্নাথ ধাম মন্দির কমিটি নিয়ে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব সাহার অভিযোগ পাওয়ার পর মন্দির পরিদর্শনে যাই। সেখানে মন্দির কমিটির সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বসে মিলে-মিশে এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কমিটি গঠনের আহ্বান জানাই।
কমিটি গঠন নিয়ে চলমান বিরোধ দ্রুত নিরসন করে সাচার জগন্নাথ ধামের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন সনাতন সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে যেন নতুন করে বিভাজন সৃষ্টি না হয়, সে জন্য গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রয়োজন।

মোঃ রাছেল, কচুয়া