স্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘ভাত বেড়ে রেখো, বাড়ি ফিরেই খাব।’ স্বামী বাড়ি ফিরবেন, একসঙ্গে কাটবে আরেকটি সাধারণ দুপুর—এমন অপেক্ষাতেই হয়তো ছিলেন স্ত্রী। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো স্বামীর মৃত্যুসংবাদে। ঘরে ফেরা হলো না আক্তারুজ্জামান খোকনের (৫০)। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে রেখে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুর দেড়টার দিকে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ঠেটালিয়া এলাকার শম্ভুখাঁর ব্রিজসংলগ্ন সড়কে ট্রলি ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনি নিহত হন।
নিহত আক্তারুজ্জামান খোকন মতলব উত্তর উপজেলার হানিরপাড় গ্রামের এলাহী বক্স ও জরিনা বেগমের ছেলে। তিনি একটি বেসরকারি খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্রমি’র মতলব উত্তর উপজেলার পরিবেশক ও বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক কন্যাসন্তানসহ অসংখ্য স্বজন রেখে গেছেন তিনি।
স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে কোম্পানির খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহের কাজে মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন খোকন। উপজেলার সাহেববাজারে ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি ও সরবরাহ শেষে মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।
পথে স্ত্রীকে ফোন করে বাড়ি ফিরে ভাত খাওয়ার কথা জানান। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। শম্ভুখাঁর ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রলির সঙ্গে তাঁর মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
পরে তাঁর মুঠোফোনটি সড়কে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় এক ব্যক্তি সেটি থেকে স্বজনদের খবর দেন। সংবাদ পেয়ে স্বজনেরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরা খোকনকে উদ্ধার করে মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
‘স্বামী ছাড়া আমার কী অইব, মেয়েডার কী অইব?’
প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বারবার বিলাপ করছিলেন খোকনের স্ত্রী, বোন, মেয়ে ও অন্য স্বজনেরা। স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমারে রাইখা স্বামী চইলা গেল। স্বামী ছাড়া আমার কী অইব? মেয়েডার কী অইব, কে তাঁরে দেইখা রাখব? আমার সব শেষ। স্বামীরে ছাড়া এহন ক্যামনে বাঁচুম?’
একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই কেড়ে নিল একজন কর্মজীবী মানুষের প্রাণ। ভেঙে দিল একটি পরিবারের স্বপ্ন, কেড়ে নিল স্ত্রী-সন্তানের নির্ভরতার জায়গা। যে মানুষটি বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে খাবার খাওয়ার কথা বলেছিলেন, তাঁর জন্যই এখন স্বজনদের বুকফাটা কান্না।
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মানস বড়ুয়া আক্তারুজ্জামান খোকনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মোজাম্মেল প্রধান হাসিব