প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২২ । ৪:০৭ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

শাহরাস্তির মুক্তিযোদ্ধা রফিকের জীবন যুদ্ধ বেঁচে থাকা

অনলাইন ডেস্ক
মোঃ মাসুদ রানা : শাহরাস্তির মো. রফিকুল ইসলাম সেলিম ভূঁইয়া (৬৫) স্বদেশকে হানাদার মুক্ত করতে নিজের জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে টগবগে যৌবন ও জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭০ সালের ৭ ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে আহ্বান করেন, তখন তিনি  রফিকুল সে দিন ওই ময়দানে উপস্থিত ছিলেন।
ওই  দিনই সে আহবানে  মনে প্রানে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নেন। ওই সময় তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খান বাঙালি নিরস্ত্র মানুষের উপর যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ব্যভিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন। ওই যুদ্ধকালীন সময়ে শাহরাস্তির ইছাপুরা গ্রামের চট্টগ্রাম সিটি কলেজের তৎকালীন ভিপি খোরশেদ আলম বাচ্চু কমান্ডার নেতৃত্বে হাজীগঞ্জের লাকমারা, লাউকরা,কুমিল্লার সালদা নদী, গঙ্গাসাগর, নয়নপুর এলাকায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন রফিক ।
এক পর্যায়ে যুদ্ধের ময়দানে তাদের মুক্তি বাহিনী টিকতে না পেরে ১৯৭১ সালের মে মাসে ভারতের আগরতলা মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য যোগদান করেন।
এ কাজে সহযোগিতা করেন, চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার বীর মুক্তিযুদ্ধা এড.  আব্দুল আউয়াল । দেশ স্বাধীন হলে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে হাজিগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রুহুল আমিনের নিকট মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লিপিবদ্ধ করেন তিনি। এর পর মুক্তিবার্তা সবুজ বই নং০২০৫০৬০৪৩৫, সাময়িক সনদ ক্রমিক ৩৭০০ ম- ১৩৬৪১০, বই জীবনবৃত্তান্তে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মানী ভাতার বই নম্বর ৩৩০ এসি ৩৫৩৩০/৮,  জিডিতে নাম লিপিবদ্ধ হয়। এর পর ২০০৯ সালে ভাতা সুবিধা পেয়ে তা ২০১৪  সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
২০১৫ সাল থেকে আজ অবধি তিনি আর ভাতার মুখ দেখেননি।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউপির ৬নং ওয়ার্ডের কুলশী ভূইঁয়া বাড়ির মৃত আজগর আলী ভূঁইয়া ও  মৃত মোছাঃ  ফাতেমার বেগমের ছোট পুত্র রফিকুল ইসলাম । তিনি ১৯৭২ সালে উয়ারুক রহমানিয়া উবি হতে বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করেন। এর পর ওই বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের সাথে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত জীবন কাটান ।  ১৯৮৫ সালে পারিবারিক সিদ্ধান্তেই তিনি নিজ বাড়ির চাচাতো বোন মোছা: কুলসুম বেগমকে বিয়ে করেন। তারপর জীবিকার প্রয়োজনে একমাত্র পুত্র সন্তান নাইন(৩) স্ত্রী কুলসুমকে নিয়ে ঢাকা মিরপুরের ১০নং গোল চক্করের সি ব্লকে আস্তানা গাড়েন।
ওই সময় তিনি বহু কাজ খুঁজে না পেয়ে ড্রাইভারি প্রশিক্ষণ নিয়ে ট্রাক সমবায় সমিতির আন্ডারে  হেলপারের চাকরি করেন। এতে তার জীবন ও জীবিকা মোটামুটি ভালোই কাটছিল। এরপর ১৯৯২ সালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে  ঢাকার মিরপুরের বাসায় অগ্নিকাণ্ডে প্রিয় স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র  অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এতে রফিক হয়ে পড়েন অসহায় বিমর্ষ। কিছুদিন পর প্রীয়জন হারানোর শোক কিছুটা কাটিয়ে বন্ধু-বান্ধবের পরামর্শে চলে আসেন গ্রামের বাড়ির শাহরাস্তির কুলশীতে। সেখানে একটি ঘরে স্থানীয়দের দেওয়া অন্ন বস্ত্রের সহযোগিতায় শুরু হয় নতুন জীবন।
এরই মধ্যে দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কদর বাড়তে থাকলে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের রণাঙ্গনের অবদানের স্বীকৃতি টুকুর সুফল পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এরপর স্ত্রী সন্তান হারা, পরিবার-পরিজন ছাড়া, মুক্তিযোদ্ধা রফিকের শুরু হয় নতুন জীবন যুদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট অফিসের হিসেব-নিকেশের ধূম্রজালে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও ভাতার সুবিধা থেকে হঠাৎ করে বঞ্চিত হয়ে পড়েন। এতে জগতের দারিদ্রতার তিমির আধার গ্রাস করে তাকে। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। দু’মুঠো ভাতের জন্য তাকিয়ে থাকতে অন্যের মুখের দিকে। বর্তমানে  জীবিকা নির্বাহের কোন অবলম্বন না থাকায় নিজের অসুস্থ দেহকে টেনে হিঁচড়ে স্থানীয় উয়ারুক বাজারে হাজির করেন প্রতিদিন ।সেখানে সময় কাটে পত্রিকা পড়ে ও সমবয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গল্প করে। এদের মধ্যে কারো দয়া হলে মুখে তুলে দেন একটু আহার।
অথচ দেশের জন্য জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধা রফিক আত্মসম্মানের ভয়ে নিজের অভাব ও অনটন বিন্দুমাত্র বুঝতে দেন না কাউকে। যেদিন কারো সুদৃষ্টি না পড়ে সেদিন এক  গ্লাস সাদা পানি মুখে তুলে অপলক চাহনি নিয়ে ফিরে আসেন নিজ গৃহে। এত প্রতিকূলতার মধ্যে  বার্ধক্য শরীরে জেঁকে বসেছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁটু ব্যথা, মাথা ব্যথা, হার্টের রোগ।
জীবন প্রদীপ বাঁচিয়ে রাখতে মাঝে মধ্যে সরকারি হাসপাতাল থেকে  কিছু ঔষধ সংগ্রহ করে মুখে তুলছেন। গেল বর্ষায় তার থাকার একমাত্র ঘর টুকু প্রায় অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে সয়লাব হয়ে যেত। বর্তমান শীতেও হাড় কাঁপছে ।
আগামী বর্ষার কথা চিন্তা করে রফিক আক্ষেপ করে বলেন,আজ আমি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বীকৃতি ও ভাতা বঞ্চিত । এদেশটিকে স্বাধীন করার জন্য বহু চেষ্টাই তো করেছি। আমার বাকি জীবন টুকু বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে আরেকটি যুদ্ধ করি।
এ প্রসঙ্গে, শাহরাস্তি আলিপুর গ্রামের ভারপ্রাপ্ত টামটা দক্ষিণ ইউপি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল বাশার বলেন, রফিক একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আমারও  প্রশ্ন সে কেন ভাতা পাচ্ছে  না?
এ বিষয়ে  শাহরাস্তি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা সভাপতি মো. শাহজাহান বলেন, রফিক আমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে, আমি কমান্ডার সে ভাতা পায় না, রফিকের মত ভাতা বঞ্চিতের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নিলে পরিবারগুলো যেমনি উপকৃত হতো। তেমনি মুক্তিযোদ্ধারা স্বীকৃতি নিয়ে আত্মসম্মানের সহিত খেয়ে পরে কবরে যেত।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন