প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৩ । ৪:৩২ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রেন ভ্রমণের একদিন

অনলাইন ডেস্ক
লেখক পরিচিতি : মোঃ রুহুল আমিন সাংবাদিক, শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী: পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারি মঙ্গলবার নিজের পেশার অংশের একটি কাজে মেঘনা এক্সপ্রেসে স্থানীয় চিতোষী রেলস্টেশন থেকে নির্ধারিত ৬ টার পরিবর্তে ১০ মিনিট বিলম্বে আসা ট্রেনে চেপে বসলাম। আমাদের চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম যাতায়াতের জন্য এই ট্রেনটি অনেক জনপ্রিয়। ইদানিং চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম যাতায়াতের জন্য আরও ট্রেন বাড়াবার দাবি উঠেছে। এই লাইনে চট্টগ্রামে যেতে আরও ১টি মেইল ও ১টি লোকাল,ঢাকা ও সিলেট যাতায়তের জন্য একটি করে ২টি মেইল ট্রেন চালুর কথা শুনা যায়। চাঁদপুর থেকে ট্রেনে শুধু চাঁদপুরবাসী নয় বরিশাল সহ কুমিল্লা, ফেণী-নোয়াখালি অঞ্চলের অনেক মানুষ বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে প্রয়োজনীয় অফিস ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ সারতে যতায়ত করে। সে যাকগে, আমার ট্রেন ৬:৩৫টায় লাকসাম জংশন পৌঁছে। চট্টগ্রামের পথে লাঙ্গলকোট, হাসানপুর, ও ফেণী জংশন থামে। সকাল ৯:২৫টায় চট্টগ্রাম বটতলী রেলস্টেশন পৌঁছে। ট্রেনে চট্টগ্রাম যাওয়া আসার এই কয়েক ঘন্টা ভ্রমণে পথে পথে দেখলাম বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্প, কৃষি জমিতে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠা, এছাড়া নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠানের দালান-কোঠা নির্মাণ। কিছু যাত্রী টিকেট করে দাঁড়িয়ে চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম যাতায়াত করা। স্টেশনে ও গাড়িতে কিছু হকারের পণ্য বিক্রির হাঁক-ডাক। উপাসনালয়ের খেদমতকারীরা পবিত্র স্থানের নামে সাধারণ যাত্রীদের নিকট হতে দান-খয়রাত নিচ্ছেন। পূর্ণ্য অর্জনের অভিলাষে যাত্রীদের কেউ কেউ নিয়ত করে দান-খয়রাত করছেন। এরই মাঝে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা অনেকটা জোর করে টাকা নেয়ার বিরক্তিকর আচরণ লক্ষ্য করি। এদের বিরক্তিকর আচরণ প্রায় সকল যাত্রীর মুখ গোমরা করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেনে নিচ্ছেন। আমাদের ট্রেন নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দশ্যে ছুটে চলেছে। পথিমধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ট্রেন শো শো করে দ্রুতবেগে ছুটে যাচ্ছে আমাদের ফেলে আসা পথের দিকে। যেন একদন্ড দাঁড়াবার পুষরত নেই। কে যেন পিছন থেকে তাড়া করছে। প্রতিমাসে নিয়ম করে আমার এ দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছে পেশাগত কারনে।
সোহেল নামের লাঙ্গলকোট থেকে উঠা একযাত্রী মেয়ের বাসায় যাচ্ছেন শীতের পিঠা নিয়ে। কথায় কথায় বললেন, মাত্র কয়েক মাস হল মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের আবদার এই শীতে মায়ের হাতের তৈরি আন্তাশা,পুয়াবড়া,ফুলি,কাঁঠাল পাতার পিঠা খাবে, তাই মেয়ের আবদার বাখা আর মেয়েকে এক নজর দেখতে বাড়ির কাজ ফেলে রেখে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন। মেয়ের মা বলে দিয়েছে পারলে মেয়েকে নাইউর নিতে। জানতে চাইলাম আজকে আবারও ফিরে আসবেন কি-না? জবাবে দিলেন, যদি মেয়েকে নিয়ে আসতে পারি তবে একদিন থাকতে পারি, আর মেয়ে না আসলে আজই বাড়ি ফিরে যাবো।
ইতিমধ্যে টিকেট চেকার যাত্রীদের টিকেট দেখতে আমাদের বগিতে এসেছেন। খেয়াল করলাম কিছু কম বয়সী ছেলে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। বুঝলাম এরা বিনা টিকেটের যাত্রী হবে হয়তোবা। যদিও এখন বিনা টিকেটে রেলে ভ্রমণ করার সুযোগ খুব কম। কিন্তু রেলের কিছু অসৎ কর্মচারীর সহায়তায় এখনও কিছু যাত্রী বিনা টিকেটে রেলে ভ্রমণ করে থাকে । এদের আচরণ ও কথাবার্তা শুনলে ও দেখলে বুঝা যায়। আমাদের বগির এক ভদ্রলোক চার সিটে পাঁচজন বসেছেন। তিনি এক মেয়ে ২ছেলে সহ ৫জন, কিন্তু টিকেট করেছেন ৪টি। তাই একজনের ভাড়া তার কাছ থেকে আদায় করে একটি টিকেট হাতে গুজেদিয়ে আমার সহ আরও কয়েকজন যাত্রীর টিকেট না দেখেই চলে গেলেন। চট্টগ্রাম বটতলী স্টেশনে পৌঁছে আমি বিকাল ৫:১৫টায় ছেড়ে আসা মেঘনা এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকেট কেটে আমার গন্তব্যে চলে গেলাম। বলে রাখা ভালো চট্টগ্রাম বটতলী স্টেশনে টিকেট নিতে মোটেও সমস্যা বা হয়রানি হতে হয়নি আমার। মাস কয়েক আগে উপরের নির্দেশে বটতলী স্টেশনে যারা টিকেট নিয়ে অনৈতিক বাণিজ্য করতো তাদেরকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ধরে নিয়ে আদালতে সোপার্ধ করায় এখন আর তাদের দৌরাত্ম নেই বললেই চলে। এজন্য সরকার তথা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে।
ফিরতি পথে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম স্টেশনের বিশ্রামাগারে। এসময় পরিচয় হয় চাঁদপুর শহরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোঃ শাহাজাদা আখন্দ এর সাথে। তিনি ব্যবসার কাজে দুপুরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসেছেন। আলাপচারিতা একটু নিবিড় ও গভীর হওয়া প্রসঙ্গক্রমে পারিবারিক কথা আসলো। ব্যবসায়ী শাহাজাদা ২ কন্যা সন্তানের বাবা পরিবার চাঁদপুরে থাকেন। মেয়েরা চাঁদপুর শহরের একটি স্বনামধন্য বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে তাঁর ছেলেবেলা থেকে সম্পর্ক। ভবিষ্যতেও ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতি করবেন। একই ট্রেনের যাত্রী হয়ে তিনি যাচ্ছেন চাঁদপুর শহরে আর আমি পথে নেমে পড়ি।
দিনের শেষে ফিরতে ট্রেনেও একই চিত্র ছিলো, তবে ফিরতি ট্রেনের যাত্রী আসন সংখ্যার কম থাকায় আসার পথে যে বিড়ম্বনা হয়েছে তা খুব একটা ছিলনা। ফিরতি ট্রেন শো শো করে বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে সামনে এগিয়ে ছুটে চললো। আমিও কয়েক ঘন্টার স্মৃতি নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি বাড়ির পথে। এই কয়েক ঘন্টায় মানুষের সুখ-দুঃখ যেমন দেখেছি, দেখেছি বহুরুপী মানুষও। জীবন চলে জীবনের গতিতে এই গতি পূর্ব নির্ধারিত। কেউ চাইলে জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারেনা, জীবনকে আটকিয়ে রাখা যায় না। একজন মানুষ কখনো নিয়তির বাহিরে যেতে পারেনা। আর কখনো পারবেও না। মানুষ পৃথিবীতে আসে একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য। আর এই নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে থাকার বা যাবার কারো কোন সুযোগ নেই। মানুষ পৃথিবীতে আসে পরিক্ষা দিতে এই পরিক্ষা শেষে আবারও ফিরে যেতে হয়, ফিরে যেতে হবে নিজ নিজ গন্তব্যে। এ-ই পৃথিবীতে স্বল্প সময় শেষে মানুষ যা নিয়ে যায় তারই বিচার হবে শেষ বিচারের দিনে। কারওই অর্জিত ধন সম্পদ কেউ সাথে করে নিয়ে যেতে পারবেনা। সবাইকে তার কর্ম ফল ভোগ করতে হবে। আমাদেরকে ভাবতে হবে আমার পূর্বে কত মানুষ পৃথিবীতে এসেছে, আমার পরে আরও কত মানুষ পৃথিবীতে আসবে। কেউ কি থাকতে পেরেছে না পারবে। কিন্তু আমাকে মনে রাখারমত এমন কি কাজ আমি মানুষের কল্যাণে রেখে যাচ্ছি যার কারনে আমাকে মনে রাখবে বা স্বরণ করবে? একটি সফল ও সার্থক জীবনের জন্য মানুষ হিসেবে এই ভাবনাটা আমাদের সবার আসা সংগত।
জীবনের এই বোধ যারা বুঝবে তারাই সফল ও সার্থক বলা যাবে। মানব সভ্যতার উন্নতিতে সকল মানুষ অবদান রাখবে এমন প্রত্যাশা কায়মনে কামনা করি।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন