মাসুদ হোসেন : চাঁদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ চাঁদপুর সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। “ঐতিহ্যের উৎকর্ষে উল্লাসে” স্লোগানকে সামনে রেখে গতকাল শনিবার উৎসবের সমাপনী দিনেও ছিল নানা আয়োজন। দুই দিনব্যাপী এ বর্ণিল আয়োজনে চাঁদপুর স্টেডিয়ামে দিনভর ছিল উৎসবের আমেজ। দিনগুলোকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য উদযাপন কমিটি আনন্দ শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, গুণীজন সম্মাননা, স্মৃতিচারণ, মধ্যাহ্ন ও প্রীতিভোজ, পুরস্কার বিতরণ ও দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী-নৃত্যশিল্পীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্মৃতিচারণ করেন নবীন প্রবীণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বলেন, প্রাণের ক্যাম্পাস চাঁদপুর সরকারি কলেজের সাথে একটা আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। অনেক দিন পর ক্যাম্পাসে এসে অনেক ভালো লেগেছে। মনে হয় আবার যদি ওই দিনগুলো ফিরে পেতাম। দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে ক্যাম্পাস ঘুরবো, আনন্দ-ফূর্তি করবো সব মিলিয়ে অনেক ভালোলাগা কাজ করছে। অনেকে বলেন, এ উৎসবে যোগদান করতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। শুক্রবার কলেজ ক্যাম্পাসে আসার সাথে সাথেই যখন উৎসবের গিফটটা পেয়েছি তখন থেকে অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করেছে। চাঁদপুর সরকারি কলেজ জেলার ঐতিহ্য ও অহংকার। এ কলেজের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস। ৭৫ বছর পূর্তিতে অংশগ্রহণ করতে পেরে সত্যিই ভালো লাগছে।
গত শুক্রবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসবে মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে নবীন প্রবীণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে চাঁদপুর সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে এক বর্ণাঢ্য র্যালী বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক পদক্ষিণ করে চাঁদপুর স্টেডিয়ামে এসে শেষ হয়। পরবর্তীতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, গীতা ও ত্রিপিটক পাঠের মধ্যে দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে চাঁদপুর সরকারি কলেজের গত ৭৫ বছরে প্রাক্তণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগকারী সকল শহীদ এবং সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের সম্মানার্থে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করেন উপস্থিত সকল আমন্ত্রিত অতিথি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ। শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে উক্ত উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি।

উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অসিত বরণ দাশের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও চাঁদপুর-৩ আসনের সাংসদ আলহাজ্ব ডা. দীপু মনি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, আমার অনেক ঋণ এই চাঁদপুরের কাছে এবং চাঁদপুরের মানুষের কাছে। তার কারন আপনারা আপনাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে আমাকে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন। আপনাদের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি বলে, আপনাদের প্রতিনিধি হওয়ার সম্মান পেয়েছি বলে এই সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এবং এই চাঁদপুর কলেজের যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সে উন্নয়ন কাজে শরিক হবার আমার সুযোগ হয়েছে। আমি চাঁদপুরবাসীর কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এবং তাদের এ ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারবো না। আমি চাঁদপুর কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে নয় একজন শিক্ষামন্ত্রী ও এখানকার এমপি হিসেবে উপস্থিত হয়েছি। তবে এই কলেজের জন্য আমার এক অন্য ভালোবাসার টান আছে। নিজের চাইতে মায়ের জিনিস অনেক প্রিয় হয়। আমার মা এই কলেজের ছাত্রী ছিলেন। কাজেই সেই সূত্রেই নিশ্চই এই কলেজের ৭৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সঙ্গে আমার একেবারে নাড়ির টান আছে।
তিনি আরো বলেন, এই কলেজের ৭৫ বছরের পথ পরিক্রমায় একেবারে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন যে উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আমাদের জাতির পিতার রাজনৈতিক গুরু এবং গণতন্ত্রের মানুষপুত্র হিসেবে খ্যাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। এই কলেজের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত যারা যুক্ত ছিলেন সকলকে আমি আমার শ্রদ্ধা জানাই। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। তিনি এই চাঁদপুর কলেজ মাঠে তিনবার এসেছিলেন। আমি আত্মত্যাগকারী সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। পরিশেষে আমি এই চাঁদপুর সরকারি কলেজের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

কলেজের প্রাক্তণ শিক্ষার্থী সাব্বির আজমের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, বুয়েট এর ভিসি প্রফেসর ড. সত্য প্রশাদ মজুমদার, চাঁদপুর সরকারি কলেজের প্রাক্তণ শিক্ষার্থী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ শফিউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনার আনিসুর রহমান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আহসানুজ্জামান কল্লোল, সাবেক সচিব ও শিশু সাহিত্যক কাজী ফারুক হাসান, স্বাধীনতা যুদ্ধে চাঁদপুরকে মুক্ত করার আঘত হানা বিএলএফ কমান্ডার আবেদ মুনসুর, চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান ও জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত গীতিকার কবির বকুল।
কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও চাঁদপুর পৌর মেয়র জিল্লুর রহমান জুয়েলের স্বাগত বক্তব্যে অনুষ্ঠানের স্বর্ণস্মৃতি নামে স্বরণিকা ও কলেজের জার্নাল ভলিউম-২ এর মোড়ক উন্মোচন করেন আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ। এরপর উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও সদস্য সচিব শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে উদযাপন পরিষদের উত্তরীয় পড়িয়ে দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অনুজ বিজ্ঞানী ড. সমির কুমার সাহা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোস্তফা কামাল, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত বিজ্ঞানী বুদ্র দেবসহ, চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ডা. জে আর ওয়াদুদ টিপু, কলেজের প্রাক্তণ শিক্ষার্থী এনএম খান মুরাদ, শাহাবুদ্দিন অনু, হাইমচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নূর হোসেন পাটওয়ারী, ফরিদগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম রোমান, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এএইচএম আহসান উল্যাহ, সাবেক সভাপতি কাজী শাহাদাত, শরীফ চৌধুরী, চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বাবু এবং চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।
উদযাপন কমিটির তথ্য অনুযায়ী সাড়ে সাত হাজার শিক্ষার্থীর রেজিষ্ট্রেশনে এবং ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা চাঁদপুর হামিম সাইন এন্ড ক্যামেরা হাউজের তথ্য অনুযায়ী চাঁদপুর স্টেডিয়ামে স্বরণকালের রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ৫২ হাজার মানুষ চাঁদপুর সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছেন।

অনলাইন ডেস্ক