প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৩ । ১১:১৬ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

সোনার হরিণে পরিনত জাতীয় মাছ ইলিশ

মোঃ মাসুদ হোসেন
কাগজ-কলম, বইয়ের পাতা কিংবা মুখস্ত বিদ্যায় বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ঠিকই। কিন্তু এই মাছের স্বাদ গ্রহণ করা বর্তমানে কস্টসাদ্য হয়ে পড়ছে দেশের নিন্ম ও মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের। কোন চষাবাদ ছাড়াই সত্তরের দশকে ইলিশকে জাতীয় মাছ ঘোষনা হলেও দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে। স্বাদে, ঘ্রাণে, রূপে অন্যান্য মাছকে পেছনে ফেলে ইলিশ বাঙালি সমাজে ‘মাছের রাজা’ হিসেবে সমাদৃত। শুধু যে রূপে গুণে বিষয়টা এমন ও না, অন্যান্য মাছের পুষ্টিগুণের দিক থেকেও এগিয়ে আছে এই সমুদ্র থেকে আসা নদীর রাজা। এই মাছটিতে আছে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। পুষ্টিবিদদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম ইলিশ মাছে প্রোটিন থাকে ২১.৮ গ্রাম, ভিটামিন সি থাকে ২৪ মিলিগ্রাম, শর্করা আছে ৩.৩৯ গ্রাম, খনিজ রয়েছে ২.২ গ্রাম ও চর্বি ১৯.৪ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন খনিজ রয়েছে ১৮০ মিলিগ্রাম, তাছাড়াও রয়েছে খনিজ লবণ, আয়োডিন এবং লিপড। যা অন্যান্য মাছ ও মাংসের তুলনায় অনেক বেশি। ওয়ার্ল্ড ফিশের হিসাবে ওমেগা-৩ পুষ্টিগুণের দিক থেকে স্যামন মাছের পরের স্থান এই ইলিশের। জনপ্রিয়তায় শীর্ষে স্যামন ও টুনা মাছের পরই এই আমাদের ইলিশের অবস্থান। চিকিৎসকদের মতে, ইলিশ মাছ হার্ট সুস্থ রাখে, রক্ত সঞ্চালন ও বাত নিয়ন্ত্রণের সহায়ক, রাতকানা রোধে, ক্যান্সার মোকাবেলায়, হাঁপানি রোধে, অবসাদ দূর করতে, ত্বকের যত্নে, শিশুদের মস্তিষ্কের গঠন করতে সহায়ক। গবেষণা মতে, ইলিশে আছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন। তাছাড়াও আছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, যা রক্তের কোলেস্টেরল ও ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, ফলে হার্ট সুস্থ থাকে। তাই হৃদরোগীদের জন্য ইলিশের তেল উপকারী। ইলিশ মাছে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ একেবারেই কম। এই মাছের স্বাদ, ঘ্রাণ আর উপরোক্ত গুণের কারণেই মাছের রাজার মর্যাদা পেয়েছে এই ইলিশ মাছ। কিন্তু বহুগুণ থাকা এই মাছটি এখন ক্রয় ক্ষমতার বাহিরেও চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে।
জাতীয় মাছ ইলিশের এই ভরা মৌসুমেও চড়া দামে বাজার সয়লাভ। জানা যায়, এক সময়ে চাঁদপুরের ইলিশ দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি হওয়া এই ব্যান্ডিং জেলাকে ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর বলা হলেও সেখানকার সেই ঐতিহ্য আর এখন নেই। কারন ঐ জেলার সাধারণ ক্রেতা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী চাঁদপুরের ইলিশের উৎপাদন কম থাকায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশ দিয়ে চাহিদা পূরণ হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের মাছ দিয়ে চাঁদপুর মাছঘাটে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে প্রতিদিন সকাল থেকেই মাছঘাটে ব্যস্ত সময় পার করছেন ইলিশ ব্যবসায়ীরা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এ ঘাটে ৩০০-৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা, ৫০০ গ্রামের উপর থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি প্রায় ১৬০০ টাকা, ১২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১৮০০ টাকা ও দেড়-দুই কেজি ওজনের ইলিশের কেজি প্রায় ২ হাজার টাকার উপরে পাইকারি বিক্রি করা হচ্ছে। গত কয়েকদিন আগে তিন কেজি ওজনের এক ইলিশ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ারও খবর রয়েছে এই আড়তে। এত দামে পাইকারি বিক্রি হলে খুচরা বিক্রি হবে তো আরো অনেক দামে। কামাল হোসেন নামে ওখানকার এক আড়তদারের দেয়া বক্তব্যে তিনি জানান, আগের তুলনায় মাছ একটু বেশি থাকলেও দাম কমেনি। দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতা অনেক কম। বাজারে মাছের দাম কমলে ক্রেতা পাওয়া যেত। যার কারণে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। চাঁদপুরের লোকাল মাছ অনেক কম। দক্ষিণাঞ্চলের মাছই বেশি। আমাদের বাজারে চাঁদপুরের লোকাল মাছ চলে বেশি। লোকাল মাছের বাজার অনেক চড়া। বেশি দাম থাকার কারণে বিক্রিও কম।
এদিকে দেশের বাজারে এত ইলিশ মাছ। তবুও দামে আগুন। দেড় হাজার টাকা কেজি চায় খুচরা বিক্রেতারা। সাধারণ মানুষ কি এই দামে ইলিশ কেনা সম্ভব? এই সময় ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু দাম নিন্ম ও মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের নাগালের বাহিরে। তবে কি ইলিশ মাছ বড় লোকের খাবার? গরিবের কপালে এখন আর নেই এই জাতীয় মাছটি। এখন ইলিশ কেনা মানেই বিলাসিতা করা। নিন্ম ও মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নেয়া আগামী প্রজন্ম চিনতেই পারবে না বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ। তারা বইয়ের পাতায় পড়লেও বাস্তবে দেখতে পাবে না কাঙ্খিত এ মাছটিকে। কারণ হিসেবে- এসব পরিবারের অভিভাবকরা এত চড়া দামে ইলিশ কিনে সন্তানদের খাওয়ানো আসলেই অসম্ভব। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের উচ্চ দামের সাথে স্বল্প আয়ের এসব মানুষগুলো ইলিশের স্বাদ পাওয়া স্বপ্ন দেখতে হবে। তবে একসময়ের সাধারণ মানুষের মাছ এখন ধনীদের প্রিয় খাবার। কিন্তু ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার এই মাছ রক্ষায় অনেক অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে। বছরের কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে মা মাছ ও জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করেছে। আর মৎস্যশিকারিদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করছে। যে কারণে দেশে ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই মাছ এখনো দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে আসেনি। কারণ, এই মাছ ধরা থেকে শুরু করে পুরো বিপণনব্যবস্থা একটি সামন্তচক্রের হাতে বন্দী। এ কারণে ইলিশের দাম কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। ওই চক্র ভাঙতে পারলে জাতীয় এই মাছ সবার ক্রয়সীমার মধ্যে আসবে। চাষবিহীন এই জাতীয় মাছটির মূল্য বৃদ্ধি হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হোক মৎসবিভাগসহ প্রশাসনের উচ্চ মহলের কর্মকর্তারা।
লেখকঃ
সমাজকর্মী ও সাংবাদিক
চাঁদপুর সদর।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন