প্রকাশের সময়: বুধবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৩ । ১১:১৪ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

টিকটকে অন্ধকার পদযাত্রা

রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ

মানুষ স্বভাবতই নিজেকে ফুটিয়ে তুলতে চায়। মানুষ নিজের প্রশংসা শুনতে ভালোবাসে। যেসব মানুষ বলে ‘প্রশংসা আমার ভালো লাগে না’ তাকেও প্রশংসা করলে তিনি খুশি হন। আগে এসব প্রশংসার জন্যে মানুষ সামাজিক অনুষ্ঠান করতো। অথবা যাদের উচ্চাভিলাষ ছিল কিংবা রাজনৈতিকভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তারা সাংবাদিকদের শরণাপন্ন হতেন। কেউ কেউ আবার আর্টিকেল/কলাম লিখে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখতেন।

নিজেকে ফুটিয়ে তোলার কাজটি মানুষের কাছে সহজ হয়ে যায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চালুর মাধ্যমে। তবে দিনে দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর সামাজিক থাকেনি। অনেক অসামাজিক কাজের মাধ্যম হয়ে উঠে সেসব প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে টিকটক অন্যতম।

টিকটক মূলত চীনের আবিষ্কার। চীনে এর নাম দৌয়িন। ঝাং ইয়েমি ২০১৬ সালে টিকটক চালু করেন। বর্তমানে এটি এশিয়ার নেতৃস্থানীয় ছোট ভিডিওর প্ল্যাটফর্ম এবং বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বড় সঙ্গীত ভিডিওর সম্প্রদায় হিসেবে এটি বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান অ্যাপ্লিকেশন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অ্যাপটি ২০১৮ সালের জুন মাসে ১৫০ মিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারীর মাইলফলকে (৫০০ মিলিয়ন মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী) পৌঁছেছে এবং ২০১৮ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা অ্যাপ্লিকেশন ছিল, আনুমানিক ৪৫.৮ মিলিয়ন ডাউনলোড হয়।

নাচ, কৌতুক এবং শিক্ষার মতো বিষয়ে ৩ থেকে ৬০ সেকেন্ড পর্যন্ত সময়সীমার বিভিন্ন ধরনের ছোট ভিডিও তৈরি করার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। সব ঠিকই ছিল। তবে সমস্যা শুরু হয় যখন টিকটক দিয়ে উপার্জন করা শুরু হয়। উপার্জন করতে হলে দরকার প্রচুর ভিউ। ভিউ পেতে এক নোংরা খেলায় মেতেছে এর ব্যবহারকারীরা। ভালো কন্টেট নেই, বিষয়টি তেমন নয়। তবে মানুষের মনোযোগ পেতে এমন কিছু কন্টেট আপলোড করা হচ্ছে, যা পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে আর দেখা যায় না।

টিকটকের বেশিরভাগ ব্যবহারকারী তরুণ বয়সের। তরুণ বয়সে মানুষ এক ধরনের আবেগের মধ্যে চলে। সেই আবেগের কারণে ভুল পথে পা দেয়াটা আস্বাভাবিক কোনও ব্যাপার নয়। মূলতঃ বাস্তবেও ঘটছেও তাই। টিকটক একটি মোবাইল অ্যাপস হলেও এর নেতিবাচক দিক অনেক বেশি। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের বাস্তবতা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে টিকটক। শুধু তা-ই নয়, তাদের মধ্যে উগ্রতা, অশালীনতা, অশ্লীলতা, কল্পনাপ্রবণতার মতো বিভিন্ন জটিল মানসিক রোগ তৈরি করছে। যারা ক্রমাগত এই অ্যাপস ব্যবহার করে তাদের মধ্যে বিশেষ মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। অতিরিক্ত টিকটকের ব্যবহারের ফলে মানসিক ভারসাম্যহীনতা, বাস্তবতার প্রতি বিমুখতা, মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অবনতির মতো ভয়ানক জটিল মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে।

টিকটক অ্যাপসের ব্যবহারের কারণে এমন কিছু নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ভিডিও আপলোডকারীকে জীবনের ইতি টানতে হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আপলোডকারী বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছে। কিছুদিন আগে ভারতীয় এক যুবক মেয়েদের পোশাক পরে মেয়েদের রূপে অভিনয় করে ভিডিও আপলোড করে। সাধারণ মানুষজন ছেলেটিকে মেয়েরূপে দেখে তাকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মজা করতে থাকে। সবার মজা এমন একটি পর্যায় চলে যায়, যা ছেলেটি শেষ পর্যন্ত না নিতে পেরে আত্মহত্যার পথে চলে যায়। ইয়েঙ্ক নামে চায়নার লাইভ স্ট্রিমিং গার্ল তার সুরেলা কণ্ঠে লাইভ গান গেয়ে টিকটকে ভিডিও বানিয়েছিল এবং লাখো মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল। যখন ইয়েঙ্কে চায়নার জাতীয় সংগীত একটু ভিন্নভাবে গেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করে, সেটি চায়নার মানুষ খুবই অপছন্দ করে এবং তাকে জাতীয় সংগীতের অবমাননার দায়ে পাঁচ দিন জেল খাটতে হয়েছিল। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের চিফ মিনিস্টার নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে একটি ছেলে টিকটকের ভিডিও প্রদান করে। সেই ভিডিওটির এডিটিং দেখে মনে হয়েছিল চিফ মিনিস্টার কিছুটা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় আছেন, কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই নয়। এই ভিডিওতে চিফ মিনিস্টারের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্যে বিভিন্ন ধারায় ছেলেটাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। চায়নায় মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ির লোগো খুলে ফেলার ট্রেন্ড তৈরি হয়েছিল টিকটকের মাধ্যমে। এসব ভিডিও দেখে অনেকে অন্যের গাড়ির লোগো চুরি করা শুরু করেছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হুয়োং নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এসব উদাহরণের মাধ্যমে টিকটকের ভয়াবহতা আন্দাজ করা যায়। সব ক্ষেত্রে বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় মজা করার আগে ভেবে নিতে হবে সবকিছুর একটি পরিসীমা রয়েছে। সীমা ছাড়িয়ে কোনো কিছু করলে তা সব সময় অকল্যাণ বয়ে আনে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা কিছুই প্রকাশ করা হয় না কেন তা ডিলিট করে দিলেও পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সেটা থেকে যায়। পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে কেউ না কেউ ওকে ডাউনলোড করে রাখতে পারে এবং সময়মতো ব্যবহার করতে পারে। তাই এ ধরনের মানসিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।

নিজে সুখে থাকা, পরিবারকে সুখে রাখা আসল ব্যাপার। তখন সামাজিক সুখ আপনা-আপনি সামনে চলে আসে। সেই সুখ হয় চিরস্থায়ী। যে সুখের সাথে অন্যকিছুর তুলনা চলে না। আমরা ডিভাইস থেকে যতটা দূরে থাকতে পারব, সুখ তত আমাদের কাছে সহজলভ্য হবে। পরিবারের সাথে মেশার আনন্দ-ই হোক আমাদের প্রকৃত আনন্দ। সে আনন্দের রেশ বহমান থাকুক আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তথ্যসূত্র : গুগল ও উইকিপিডিয়া।

লেখক পরিচিতি : রাশেদ শাহরিয়ার পলাশ, গণমাধ্যম কর্মী।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন