প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২২ । ১:২৮ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রস্তুতি প্রায় শেষ, দৃষ্টিনন্দন সাচার জগন্নাথ ধাম মন্দির উদ্বোধনের অপেক্ষায়

অনলাইন ডেস্ক

মো: রাছেল : চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার সাচারে অবস্থিত পুন: নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সাচার জগন্নাথ ধাম মন্দির এখন উদ্বোধনের অপেক্ষার প্রহর গুনছে। নতুন রূপে নতুন সাজে ১শ ৫৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী সাচার শ্রী শ্রী জগন্নাথ ধাম নতুন মন্দিরের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে । এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথ যাত্রা উৎসব সাচার জগন্নাথ ধামের মন্দির। নিপুণ কারুকার্য সমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন প্রায় ৬০ ফুট উচু এই মন্দিরটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য দেশের অন্যতম ধর্মীয় তীর্থ স্থান স্থাপনা হিসেবে রূপ নিয়েছে। মন্দিরটিতে চলছে শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি। আগামী ২ ফেব্রুয়ারী উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

শৈল্পিক কারুকাজ আর অপূর্ব নির্মাণশৈলীতে দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে সাচার জগন্নাথ ধাম মন্দির। পুরো মন্দিরটিতে দেওয়া হয়েছে সাদা, আকাশি ও সোনালী কালারের রং। আর কারুকাজগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ময়ুরের পেখম ও ব্রোঞ্জ রঙে।

মন্দিরটি দেখলে মনে হয়, যেন ময়ুর পেখম মেলে রয়েছে। ছোট ৮গম্বুজকে ঘিরে বড় গম্বুজে একটি সুর্দন চক্র দ্বারা এই মন্দিরটি দেখা যাবে সাচার বাজারের পশ্চিম পাশে। মন্দিরের ফটক রয়েছে তিনটি। ফটক পেরিয়ে ভিতরে রয়েছে আরেকটি ছোট ঘর। সেখানে রাখা হবে জগন্নাথ বলরাম শুভদ্রা কাঠের খোদাই করা মূর্তি। এই ঘরে কাঠের কারুকাজে নির্মাণ করা হয়েছে জগন্নাথ দেবের সিংহাসন। সোনালি রং শোভিত আসনটি নজর কাড়বে যে কারও। রয়েছে অত্যাধুনিক ঝাড়বাতি ও আলোকসজ্জা।

অনিন্দ্যসুন্দর এই মন্দিরটি দেখে এক পলকেই মুগ্ধ হবেন যে কেউ। মন্দির পরিচালনা কমিটি মনে করেন, শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নন, এই মন্দিরের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হবেন এ উপজেলায় ঘুরতে আসা দেশ-বিদেশের পর্যটকরাও।

জগন্নাথ ধাম ও সাংস্কৃতির কমিটির সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসু ও সিনিয়র সহÑসভাপতি নিখিল দাস জানান, বৃহত্তর কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলায় এটাই সব থেকে ব্যয়বহুল মন্দির। এই মন্দির নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। তৎকালীন মন্দির কমিটির সভাপতি স্বর্গীয় তিমির চন্দ্র সেন ২০১৬ সালে ১৬ই জুন যশোর বেনাপোল স্থল বন্দরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র সেনকে দিয়ে এই জগন্নাথ মন্দিরের পুন: ভিত্তি প্রস্তুত স্থাপন করেন।

মন্দিরটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। মন্দিরের প্লান, ডিজাইন ও নির্মাণ কাজ তদারকি করেন প্রকৌশলী তাপস চন্দ্র রায়। তিনি জানান, ৪ হাজার বর্গফুট জায়গার ওপর এই মন্দির নির্মাণ করা হয়। মন্দিরের উচ্চতা ৬০ ফুট। প্রবেশ এবং বের হওয়ার জন্য মন্দিরের চারদিকে তিনটি আকর্ষনীয় ফটক রয়েছে। মন্দিরটিতে রয়েছে ছোট বড় নয়টি চূড়া। কারুকাজে রয়েছে পদ্মফুল, বেলপাতা দ্বারা খচিত স্বস্তিকা। জগন্নাথ দেবকে প্রদক্ষিণের জন্য মূল মন্দিরের ভিতরে রাখা হয়েছে ফাঁকা বারান্দা। মেঝেতে দেওয়া হয়েছে মর্বেল পাথর।

জগন্নাথ মন্দিরের পূজারী শান্তি চক্রবর্তী জানান, এখানে প্রতিদিন জগন্নাথ দেবের পূজা অর্চনা দেওয়া হয়। প্রতিদিনই ভক্ত সমাগমে মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে। মন্দির পরিচালনা কমিটির কমিটির সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসু ও সিনিয়র সহÑসভাপতি নিখিল দাস বলেন, এই জগন্নাথ বাড়িতে মন্দির কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। তার জন্য মাস্টার প্লান করা আছে। নবনির্মিত জগন্নাথ ধাম মন্দিরের পার্শ্বেই দুর্গামন্দির , শিব মন্দির ও কালী মন্দির রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জাতি-ধর্মের দর্শনার্থীরা এসে প্রার্থনা ও মন্দির কমপ্লেক্সের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারবেন।

জানা যায়, হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য-বাহী সাচার রথ ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কারুকার্য খচিত দৃষ্টিনন্দন জগন্নাথ দেবের রথ। জগন্নাথ দেবের এই রথটি সাচারকে দিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে বিশেষ পরিচিতি। ঐতিহ্যবাহী সাচারের এ রথটি তৎকালীন জমিদার স্বর্গীয় গঙ্গা গোবিন্দ সেন ১২৭৫ বাংলা সনে নির্মাণ করেন। কচুয়ার সাচার রথটি অতি প্রাচীন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিকট এটি তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।

কথিত আছে, সাচার ইউনিয়নে প্রাচীনকালে একটি জমিদার বাড়ি ছিলো। যা বর্তমানে সাচার বাজারে অবস্থিত শ্রী শ্রী জগন্নাথ ধাম। মন্দিরের পাশেই সাচারের তৎকালীন জমিদার বাড়িটি এখনো জমিদারদের স্মৃতি রূপে দাঁড়িয়ে আছে। এ বাড়িতে বাস করতো গঙ্গা গোবিন্দ সেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাচার জগন্নাথ ধাম মন্দির। তিনি ছিলেন এক মহান ব্যক্তিত্ব। লোভ-লালসা তার জীবনকে কখনো স্পর্শ করেনি। জগন্নাথ দর্শনের জন্য তৎকালীন সময়ে পায়ে হেঁটে তিনি ভারতের শ্রীক্ষেত্র যেতেন। বাড়ি থেকে তার প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ও শুকনো খাবার নিয়ে পদযাত্রা শুরু করতেন জগন্নাথ দর্শনে। পথিমধ্যে যেখানেই রাত হতো সেখানেই রাত্রিযাপন করতেন। কথিত আছে রাত্রিকালে শ্রী শ্রী জগন্নাথ জমিদার গঙ্গা গোবিন্দ সেনকে স্বপ্নাদেশে বলেন, ওহে গঙ্গা গোবিন্দ সেন! তোমার আর পায়ে হেঁটে শ্রীক্ষেত্রে যেতে হবে না। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আমিই তোমার বাড়িতে যাবো। তিনি বুঝে ওঠতে না পারলে পুনরায় তাকে স্বপ্নাদেশে বললেন, ‘তোর বাড়িতে একটি মন্দির স্থাপন করবি, তোর দিঘিতে ৩ টুকরো নিম গাছ ভেসে আসবে। এ কাঠ জয়ধ্বনি দিয়ে বাড়িতে নিবি। এ কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, শুভদ্রা, বলরাম, শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ তৈরি করার জন্য তোর কাছে অভিজ্ঞ সূত্রধর আসবে’’। স্বপ্নাদেশ মোতাবেক নিমকাঠ আসলো। বিগ্রহ তৈরিতে সূত্রধর আসলো। গোবিন্দ সেন জগন্নাথ মন্দির স্থাপন করলেন। ৩০/৪০ ফুট উঁচু একটি রথ নির্মাণ করলেন। রথটির চারপাশে চারযুগের ভবিষ্যৎ বাণী চিত্রসহ খচিত ছিলো।

ঐতিহ্যবাহী এই রথটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পুড়ে ফেলে। এর পর ভক্তরা বাঁশের সাহায্যে রথ নির্মাণ করে রথযাত্রা উদযাপন করেন। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে রথটি পুন: নির্মাণ করা হয়। শিল্পীগণ রথের চার পাশের কাঠ খোদাই করে বিভিন্ন দেবদেবী, পশু-পাখি, লতা-পাতা, ফুল-ফল প্রভৃতি দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত প্রতিকৃতি অংকন করেন। এ রথ যাত্রাকে ঘিরে অগণিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্তবৃন্দের এক মহামিলন আর মহা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় এখানে।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন