শাহরাস্তি উপজেলার ঐতিহাসিক খোর্দ্দ খাল যেন শুধু একটি জলধারা নয়, এটি বহন করছে দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি অর্থনীতি ও একটি রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মৃতি। প্রায় ৪৮ বছর আগে যে খালের খননকাজ উদ্বোধন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সেই খালের পুনর্খনন কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করলেন তাঁরই পুত্র, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার (১৬ মে) দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের ওয়ারুক বাজার এলাকায় “খোর্দ্দ হতে শৈলখালী পর্যন্ত” খাল পুনর্খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় পুরো এলাকা উৎসবমুখর পরিবেশে পরিণত হয়। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থলে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর আবেগঘন পরিবেশ। স্থানীয় মতে ১৯৭৭-৭৮ সালের সেই সময়ের কথা, যখন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি শাহরাস্তিতে এসে খোর্দ্দ খাল খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেছিলেন। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে খালটি ভরাট ও সংকুচিত হয়ে পড়ায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এবং শুকনো মৌসুমে সেচ সংকট দেখা দেয়। ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, পুনরায় খাল খননের মাধ্যমে শুধু পানিপ্রবাহ ফিরবে না, ফিরবে পুরনো দিনের স্মৃতি ও কৃষির প্রাণচাঞ্চল্যও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এ খাল পুনর্খননের ফলে ২৪১ হেক্টর কৃষিজমি পুনরায় সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। এতে উপকৃত হবে প্রায় ২ হাজার ৭৮৮ কৃষক পরিবার।

পাশাপাশি মাছ চাষ, পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ উদ্যোগ।সকালে ঢাকা থেকে বিশেষ বুলেটপ্রুফ বাসে রওনা হয়ে কুমিল্লার বরুড়া হয়ে শাহরাস্তিতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে শাহরাস্তি, হাজীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে আমরা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেটি বাস্তবায়নে কাজ করছি। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখতে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।তিনি বলেন, “আল্লাহ আমাদের উর্বর মাটি দিয়েছেন। কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লে অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। আমরা চাই দেশের মানুষ খাদ্যের জন্য কখনো কষ্টে না থাকুক।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের চার কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে “ফ্যামিলি কার্ড” দেওয়া হবে, যা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ ছিল। প্রতিটি পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, নারীদের ঘরে বসিয়ে রেখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। নারীদের আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হবে। মা স্বাবলম্বী হলে পরিবারও স্বাবলম্বী হবে। তিনি জানান, কৃষকদের জন্য “কৃষি কার্ড” চালু করা হবে, যাতে সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি উপকরণ ক্রয়ে সহায়তা পাওয়া যায়। আসন্ন বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
নারী শিক্ষার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্লাস দুই থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। সেই কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারণ করে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারী শিক্ষা অবৈতনিক করার ঘোষণা দেন তিনি। পাশাপাশি মেধাবী ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়ার কথাও জানান।
একপর্যায়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মমিনুল হক-এর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শাহরাস্তিতে দ্রুত একটি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা মন্ত্রীকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই।
বক্তব্যে তিনি জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে এ জনপদের অঞ্চলের সাত শহীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে আমাদের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন,খাল খনন, কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, বৃক্ষরোপণ ও তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে চাই। দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান উচ্চারণ করেন।অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, ত্রান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হক দুলু, শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নূর উদ্দিন অপু,স্থানীয় সংসদ সদস্য লায়ন ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক এমপি, তথ্য সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত তথ্য সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন,চাঁদপুর জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান, পুলিশ সুপার রবিউল হাসান,বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন, সাবেক কেন্দ্রীয় তাতীদলের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু, শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজিয়া হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিল্লোল চাকমা, শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মীর মাহবুবুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আয়েত আলী ভূঁইয়া, হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সহ-সভাপতি আবু ইউসুফ রুপন পাটোয়ারী, সাধারণ সম্পাদক সেলিম পাটোয়ারী লিটনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী সমর্থক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন ।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গণমাধ্যম কর্মী শারমিন দীপ্তি।

মোঃ মাসুদ রানা