প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬ । ৮:২৯ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের বেহাল শিক্ষাব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিনিধি

চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী কচুয়া সরকারি কলেজে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৮১ হাজার টাকা খরচ করে লাইব্রেরির জন্য ১ হাজার ১৩৭টি বই কেনা হয়। অথচ লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করে এসব বইয়ের কোনো অস্তিত্ব পায়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অধ্যক্ষও জানিয়েছেন, বইগুলোর কোনো অস্তিত্ব তিনি পাননি। অর্থাৎ, বই না কিনেই এ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একইভাবে ২৮ হাজার টাকায় দুটি মোটর পাম্প কেনা হলেও অস্তিত্ব মিলেছে মাত্র একটির, আর ২৮ হাজার টাকায় দুটি ফোন কেনা হলেও কোনোটিরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে কলেজটির ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত থাকার পরও এ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। আবার কলেজটির ৪০ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে ২২ জনের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি তুলেছে ডিআইএ। তাদের কাছ থেকে বেতন-ভাতার ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকা ফেরত আনতে বলা হয়েছে। এভাবে কেনাকাটায় অনিয়ম ও নিয়োগ জালিয়াতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়, বিধিবহির্ভূত ব্যয় ও ভ্যাট ফাঁকির মাধ্যমে কলেজটির কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ।

১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করানো হয়। সম্প্রতি ডিআইএ কলেজটি পরিদর্শন করে কয়েক বছরের তথ্য যাচাই করে এসব অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। গতকাল সোমবার এসব অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

২২ শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি: কলেজটির ৪০ শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে ২২ জনের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি তুলেছে ডিআইএ। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম থাকায় তাদের কাছ থেকে বেতন-ভাতার ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকা ফেরত আনতে বলা হয়েছে। ডিআইএর সুপারিশে বলা হয়, ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারিকরণের পর রাজস্ব তহবিল থেকে বেতন-ভাতা গ্রহণ করায় তাদের গৃহীত সমুদয় অর্থ ফেরত ও বেতন-ভাতা বন্ধ করার জন্য রাজস্ব অফিসে পত্র দেওয়া যেতে পারে।

রেজিস্ট্রেশন ও প্রবেশপত্রের নামে শিক্ষার্থীদের ৫১ লাখ টাকা আত্মসাৎ: কলেজটিতে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এইচএসসি ও স্নাতক পাস পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড বিতরণবাবদ জনপ্রতি ৮৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এ সময়ে ৬ হাজার ১০৪ পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ৫১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা গ্রহণ করা হয়। অথচ এ টাকা আদায়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় সঠিক হয়নি। এর জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তৎকালীন অধ্যক্ষের কাছ থেকে সংগ্রহপূর্বক ব্রডশিট জবাবের সঙ্গে প্রেরণের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

কেনাকাটায় নিয়ম লঙ্ঘন: পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী ২৫ হাজার টাকার বেশি কেনাকাটা করতে হলে কোটেশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা থাকলেও এই কলেজে তা মানা হয়নি। নিয়ম না মেনেই ভাউচারের মাধ্যমে ১২ লাখ ৩৯ হাজার টাকার কেনাটাকা করা হয়েছে। এতে আবার উন্নয়ন কমিটির কোনো স্বাক্ষর নেই। এই কেনাকাটা সঠিক হয়নি উল্লেখ করে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

সম্মানী নেন শিক্ষক-ম্যানেজিং কমিটি: শিক্ষক পরিষদের নিজস্ব সভায় উপস্থিতির জন্য শিক্ষক-কর্মচারী কর্তৃক বিধিবহির্ভূতভাবে ৪ লাখ ৭১ হাজার টাকা সম্মানী হিসেবে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আপ্যায়ন বাবদ ১৮ লাখ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। লাইব্রেরি খাত থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে ৫০ হাজার টাকা সম্মানী প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও উৎসব উদযাপনে সম্মানী হিসেবে অবৈধভাবে ৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা নিয়েছেন তারা। প্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডির সভা উপলক্ষে গভর্নিং বডির সদস্যরা বিধিবহির্ভূতভাবে সম্মানী নিয়েছেন আরও কয়েক লাখ টাকা। এ ছাড়া অফিস সহকারী বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে একই কাজের জন্য দুবার সম্মানী গ্রহণ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অটো পাস পরীক্ষার্থীদের অব্যয়িত ১৮ হাজার টাকা সম্মানী আকারে বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে ঢাকায় যাতায়াত বাবদ অস্বাভাবিক খরচ করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাড়ি, পাঞ্জাবি ও কাপড় ক্রয় বাবদ অনিয়মিতভাবে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে উঠে এসেছে ডিআইএর তদন্তে।

আরও যত অনিয়ম: প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের ভর্তির অনলাইন-সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক দোকান থেকে সম্পাদনপূর্বক অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই সমীচীন হয়নি। এর জন্য ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ম্যাগাজিন খাতের টাকা নয়ছয়ের পাশাপাশি কলেজের ফটোকপি মেশিন থাকা সত্ত্বেও বাইরে ফটোকপি করে লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। এসবের পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব বাজেটের বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যয়িত ৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি খাতে জমা করে মন্ত্রণালয় বরাবর ব্রডশিট জবাব প্রদানের জন্য সুপারিশ করেছে ডিআইএ। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে কলজেটির বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আফলাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ডিআইএর বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বাকি ব্যবস্থা নেবে।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন