শাহরাস্তি উপজেলার অন্যতম শীর্ষ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোসেনপুর গাউছিয়া হাশেমীয়া সেকান্দর আলী ছুন্নিয়া ফাজিল মাদরাসার সুযোগ্য অধ্যক্ষ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাওলানা মো. রফিকুল ইসলাম এম.এ. আল-ক্বাদেরীর দীর্ঘ ৩০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ও কর্মময় জীবন শেষে অবসর গ্রহণ উপলক্ষে বিদায়ী সংবর্ধনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন, ২০২৬) মাদরাসা কর্তৃপক্ষের আয়োজনে মাদরাসা প্রাঙ্গণে এক জমকালো ও আবেগঘন পরিবেশে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়।
বিদায়ী অধ্যক্ষকে শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করতে অনুষ্ঠানস্থলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর ঢল নামে।
মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা এ.এইচ.এম. কাওছার আলমের সভাপতিত্বে ও নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর-৫ (শাহরাস্তি-হাজীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য লায়ন ইঞ্জিঃ মমিনুল হক এমপি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য লায়ন ইঞ্জিঃ মমিনুল হক এমপি বলেন, মাওলানা রফিকুল ইসলাম শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা ও অভিভাবক। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিষ্ঠা, সততা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর অবদান এ অঞ্চলের শিক্ষা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তিনি বলেন, একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের বিদায় নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় শূন্যতা। তবে তিনি যে আদর্শ, মূল্যবোধ ও শিক্ষার ভিত্তি তৈরি করে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। মাদরাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে এমপি মমিনুল হক বলেন, শিক্ষায় অগ্রগামী হলেও অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা এ প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের বিষয়ে আমি পূর্বেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, এখনও সে অঙ্গীকার বহাল রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
শিক্ষা খাত নিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে তিনি বলেন, “শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সরকার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু সনদনির্ভর নয়, জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আজ মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও ভালো ফলাফল করে দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে এবং জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিনি আরও বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে। শিক্ষার্থীদের কেবল সার্টিফিকেট অর্জন নয়, প্রকৃত সুশিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।বক্তব্যের শেষাংশে তিনি মাদরাসার উন্নয়ন ও কল্যাণে ভবিষ্যতেও পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনিরা খাতুন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সার্থকতা তখনই প্রকাশ পায়, যখন বিদায়ের মুহূর্তে শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর ভালোবাসা তাকে আবেগাপ্লুত করে। আজকের আয়োজনই প্রমাণ করে মাওলানা রফিকুল ইসলাম কতটা শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রশাসনিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর গঠনমূলক পরামর্শ আমাদের সহযোগিতা করেছে। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় অবসর জীবন কামনা করি।
এছাড়া উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব আয়েত আলী ভূঁইয়া, শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আলী আজগর মিয়াজী, ছাত্রদলের সভাপতি ইঞ্জিঃ এবিএম পলাশ, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মাসুদ হোসেন, বিএনপি নেতা মমতাজ হোসেন, আয়াত আলী বেঙ্গল, মাদরাসা গভর্নিং বডির সদস্য আনোয়ার হোসেন, শিক্ষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আহমেদ দুলালসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন।
সংবর্ধনার জবাবে বিদায়ী অধ্যক্ষ মাওলানা মো. রফিকুল ইসলাম এম.এ. আল-ক্বাদেরী আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, “আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে অত্যন্ত প্রতিকূল ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে আমি এ মাদরাসায় যোগদান করেছিলাম। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিচালনা পর্ষদ, গ্রামবাসী ও শুভানুধ্যায়ীদের অকৃত্রিম সহযোগিতা, ভালোবাসা ও দোয়ার কারণেই আমি সফলভাবে আমার কর্মময় জীবন সম্পন্ন করতে পেরেছি। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। কিছুটা আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, এ মাদরাসায় ৯ শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও নানা সমীকরণের বেড়াজালে প্রতিষ্ঠানটি কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে এ ঘাটতি পূরণ হবে। তিনি আরও বলেন, অবসরে গেলেও এ মাদরাসার কল্যাণে আমি সবসময় পাশে থাকব।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে তাঁর প্রিয় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “আমার মৃত্যুর সংবাদ পেলে তোমরা সবাই যেন আমার জানাজায় শরিক হও এবং আমার জন্য দোয়া করো।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মাওলানা রফিকুল ইসলামের স্নেহ-মমতা, ন্যায়পরায়ণতা, নেতৃত্বগুণ ও আদর্শ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে মাদরাসাটি শিক্ষা ও দীক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। বক্তারা তাঁর বিদায়ে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা বিদায়ী অধ্যক্ষের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য প্রদান করেন।
সবশেষে বিদায়ী অধ্যক্ষের সম্মানার্থে, মাদরাসা, এলাকা, দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকবৃন্দ, গভর্নিং বডির সদস্য আনোয়ার হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

মোঃ মাসুদ রানা