সবুজের বুক ছিড়ে বয়ে গেছে ৩ কিলোমিটার সড়ক। যা স্থানীয়দের কাছে গ্রীন রোড নামে পরিচিত। তবে ভারী বর্ষণ ও ইটভাটার ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের অতিরিক্ত চলাচলের কারণে এখন বেহাল দশা এই সড়কের।
চাঁদপুর শাহরাস্তি উপজেলা দক্ষিণ টামটা ইউনিয়ন ৮ নং ওয়ার্ডের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের দুপাশ জুড়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। দৃষ্টিনন্দন এই সড়কে ২০০৬ সালে সৌন্দর্যবর্ধনে গাছ লাগায় টামটা বহুমুখী সমিতি নামে একটি সামাজিক সংগঠন। এছাড়াও সরকারি পাকা রাস্তা না থাকায় এলাকাবাসীর নিজ উদ্যােগে নির্মাণ করা হয় সড়কটি। তবে এমন সড়ক নির্মাণ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন যেন ধ্বংসের মিশনে নেমেছে দুটি ইট ভাটা প্রতিষ্ঠান। ইট বহনকারী ট্রাক ও ট্রাক্টরের অতিরিক্ত চলাচলে কাঁদা মাখা সড়ক যেন এখন মৃত্যু ফাঁদ।
দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সড়কে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ ও কোথাও কোথাও পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে হাঁটু সমান কাঁদা। এতে করে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এলাকার স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও রোগীবাহী যানবাহন চালকদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গড়ে ওঠা দুটি ইটভাটা থেকে নিয়মিতভাবে ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচল করে এই সড়ক দিয়ে। এসব যানবাহন ওজন বহন সীমার বাইরে থাকায় বর্ষায় সড়কের মাটি সরে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথায়ও আবার পানি জমে কাদায় পরিণত হয়েছে। তাতে বর্ষাকালে পথচলা হয়ে পড়ে ভয়াবহ। আবার শুষ্ক মৌসুমে ধুলায় নাকাল হয় পুরো এলাকাবাসী। ফলে চলাচল যেমন কষ্টকর, তেমনই দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে প্রতিনিয়ত।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. গোলাম সরওয়ার বলেন, এই রাস্তাটাই আমাদের একমাত্র চলাচলের পথ। কিন্তু রাস্তার যে অবস্থা, তাতে করে রোগী নিয়ে যেতে ভয় লাগে। অ্যাম্বুলেন্স অথবা রোগীবাহী গাড়ি পর্যন্ত ঢুকতে চায় না এলাকায়। যাদের কারণে সড়কের দুরবস্থা তাদের বার বার বলা হলেও কোন কর্নপাত করেনি। তারা আওয়ামিলীগের আমলেও এলাকার মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে এখনো করছে। তাহলে দেশ পরিবর্তনে এতো মানুষের জীবন দিয়ে লাভ কি হলো। এছাড়াও এভাবে ফসলি জমি নষ্ট করে ইট ভাটা গড়ে তোলা যায় কিনা আমার জানা নাই। তবে আমরা চাই আমাদের দীর্ঘ দিনের এই কষ্ট লাগব হোক।
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সলিমুল্লাহ জানায়, ৫ বছর ধরে এই সমস্যায় ভুগছি। বৃষ্টি হলে আর দোকানে যাওয়ার নাম নিতে পারি না। শরীর খারাপ লাগলে ঔষধ কিনতে পারি না। আমরা গ্রামের মানুষদের রাস্তা মানেই জীবন। তবে এই রাস্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন আমাদের মরণের কারণ।
একজন স্কুলছাত্রী জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যেতে গায়ে কাদা লাগে। অনেক সময় পড়ে গিয়ে ব্যথাও পাই। আমরা চাই এই অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে রাস্তা সংস্কার করে সীমাহীন ভোগান্তি থেকে আমাদের মুক্তি দেওয়া হোক।
সৌদি প্রবাসী শাহরাস্তি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক তানজিল হোসেনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে জানান, ৪ বছর আগেও একবার বৃষ্টির মধ্যে ইট ভাটার গাড়ি চলাচলে রাস্তাটি নষ্ট হয়। পরে আমি এলাকারবাসীর সম্মতিক্রমে গাড়ি গুলো সাময়িক বন্ধ রাখতে বলি। কিন্তু গাড়ি বন্ধ না রেখে উল্টো আমাকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয় ইট ভাটার মালিক দুলাল মিয়াজি। শুধু তাই নয় স্বৈরাচারী সরকার আমলে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতো এই দুলাল। যা এখনো বিদ্যমান। তাই প্রশাসনের নিকট আকুল আবেদন এই ধরনের সমাজ বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় এনে এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।
এলাকাবাসী জানান, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলেও এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিছু অংশে লোকজন নিজেরাই ইট ফেলে চলাচলের সাময়িক ব্যবস্থা করলেও তা যথেষ্ট নয়।
স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বারের ভাষ্যমতে, ইটভাটার গাড়ির কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কথা সত্য। বার বার স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও। অজানা কারণে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আবারও প্রশাসনের সাথে আলাপ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন ইউপি সদস্য।
সড়কটি আশপাশের কয়েকটি গ্রাম সহ প্রায় ১ লাখ মানুষজনের জন্য যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এই সড়ক দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই সড়কই হয়ে উঠেছে দুর্ভোগের কারণ ও মৃত্যুপুরী।
এই বিষয়ে ইট ভাটা দুটির স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন মিয়াজির ছেলে হৃদয় মিয়াজি ও দুলাল মিয়াজির মুঠোফোনে একাধিক ফোন দিলেও, তা সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায়।
স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে ভারী যানবাহনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ ইট ভাটার গাড়ি অবাধ বিচরণ এবং দ্রুত সড়ক সংস্কারের ব্যবস্থা না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও করছেন সচেতন মহল।

মির্জা মানিক