অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির এবং অন্ধকারের ওপর আলোর বিজয়ের প্রতীক বিজয়া দশমী সনাতন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে চাঁদপুরেও অনুষ্ঠিত হয়েছে।এদিন শহরের জলাশয়ে গূহ বাড়ির পূজা মন্ডপ দিয়ে শুরু হয়ে একে একে ২৫টি পূজা মন্ডপের প্রতীমা বিসর্জন দেয়া হয়।
২১ অক্টোবর বুধবার রাতে শহরের চৌধুরীঘাটে ডাকাতিয়া নদীতে এ বিজয়া দশমী হয়। যেখানে বড় স্কীনে প্রতীমা দেখানো হয় এবং পুরো জায়গাটি সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয়। এর আগে প্রতিটি পূজা মন্ডপ বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রায় প্রতীমাসহ অংশ নিয়ে বিসর্জন ঘাটে উপস্থিত হয়।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বিসর্জন ঘাটে সার্বিক তদারকিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপি সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এমপি। এসময় তার সাথে দলীয় নেতৃবৃন্দও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় অবস্থান নেয়।
বিজয়া দশমীকে ঘিরে এক সাক্ষাৎকারে চাঁদপুর জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব অজিত সাহা বলেন, দেবী দুর্গা একটানা নয় দিন নয় রাত যুদ্ধ করার পর দশম দিনে অত্যাচারী অসুররাজ মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বসংসারকে মুক্ত করেন। তাই এই জয়কে স্মরণ করেই নাম হয়েছে “বিজয়া”।
চাঁদপুর মহিলা ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক শিপ্রা মজুমদার বলেন, বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতিতে বিজয়া দশমীর দিনটি একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে তেমনি দেবী বিদায়ের বিষাদে ভরা। সকালে দশমী বিহিত পূজার শেষে দর্পণে (আয়নায়) দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের মাধ্যমে প্রতীকী বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। এরপর বিবাহিত নারীরা দেবীর কপালে সিঁদুর ছোঁয়ানো, মিষ্টি মুখ করানো এবং নিজেরা মেতে ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায় মেতে ছিলো। এর মাধ্যমে তারা পরস্পরের সৌভাগ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন। আর সবশেষে এদিন বিকেল থেকে বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রার মাধ্যমে দেবী দুর্গার প্রতিমা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে, দেবী মর্ত্যলোক বা বাপের বাড়ি ছেড়ে পুনরায় কৈলাসে স্বামী শিবের গৃহে ফিরে যাচ্ছেন।
চাঁদপুর জেলা যুব ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব পার্থ গোপাল দাস বলেন, বিসর্জনের পর শুরু হয়েছিলো “শুভ বিজয়া”-র শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়েছে, সমবয়সীরা কোলাকুলি করেছে এবং মিষ্টিমুখ করিয়েছে। শত্রুতামূলক মনোভাব ভুলে সবার সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। বিজয়া দশমী মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, অন্যায় বা অধর্ম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সত্য ও ধর্মেরই জয় নিশ্চিত হয়।
চাঁদপুর জেলা ছাত্র ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক স্বাধীন দত্ত বলেন, এই দিনটিকে ‘দশেরা’ হিসেবেও পালন করা হয়। লঙ্কার রাজা রাবণকে বধ করে শ্রী রামচন্দ্র তাঁর স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করেছিলেন। তাই এ দিন মন্দের প্রতীক হিসেবে রাবণের কুশপুত্তলিকাও দাহ করা হয়।
এদিকে বিজয়া দশমীকে ঘিরে আগত ভক্ত, পূজারী ও সনাতন ধর্মালম্বীদের জন্য চাঁদের আলো সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বিস্কুট ও খাবার পানিয় বিতরণ করা হয়।
এসময় চাঁদপুর জেলা প্রশাসক জিয়াউর রহমান, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান,নৌ পুলিশ চাঁদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক একরামুল ছিদ্দিক,জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ রায়, সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষ, যুগ্ম সম্পাদক গোপাল সাহা,পৌর পূজা পরিষদের সভাপতি নেপাল সাহা, সাধারণ সম্পাদক সুমন কুমার জয়,জেলা জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ সভাপতি পরেশ মালাকার,সাধারণ সম্পাদক কার্তিক সরকার,হিন্দু মহাজোটের উপদেষ্টা রতন দাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। নদীতে নৌকায় বসে ধর্মীয় পুস্তক পাঠ করেন জেলা শারদাঞ্জলী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল চন্দ্র দাস ও তার মেয়ে উমা দাস।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষ বলেন, এবার অত্যান্ত সুন্দরভাবে জেলার সর্বমোট ২৩২টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা হয়েছে। এরমধ্যে চাঁদপুর সদরে ৪১টি, মতলব দক্ষিণে ৩৯টি,কচুয়ায় ৩৯টি, মতলব উত্তরে ৩৬টি, হাজীগঞ্জে ২৯টি, ফরিদগঞ্জে ২৩টি, শাহরাস্তিতে ১৯টি এবং হাইমচরে ৬টি পূজো মন্ডপে পূজা হয়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে কোন প্রকার বাধা বিগ্নতা ছাড়াই শারদীয় দূর্গোৎসব শেষ করতে পারায় সরকারসহ সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও সংস্থার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

নিজস্ব প্রতিনিধি