প্রকাশের সময়: সোমবার, ৭ আগস্ট, ২০২৩ । ১০:৩১ পিএম প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদপুরে ৫ নারীর বিসিএস জয়ের গল্প

নিজস্ব প্রতিনিধি

চাঁদপুর জেলার ৫ নারী ৪১তম বিসিএসের চূড়ান্ত প্রকাশিত ফলে ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

তারা হলেন – হাজীগঞ্জ উপজেলার আপন দুই বোন গুলে জান্নাত সুমি ও জান্নাতুন নাঈম খুশবু, সদরের সারাবান তাহুরা শিফা, মতলব উত্তর উপজেলার আয়েশা আক্তার লাবনী ও মতলব দক্ষিণ উপজেলার মুমু পোদ্দার।
এর মধ্যে আপন দুই বোনের সফলতা খুবই প্রশংসা পাচ্ছে।

সুমি ও খুশবু

হাজীগঞ্জ পৌরসভাধীন মকিমাবাদ ৪নম্বর ওয়ার্ডের মো. এয়াকুব মিয়া ও রুপিয়া বেগমের দুই মেয়ে গুলে জান্নাত সুমি ও জান্নাতুন নাঈম খুশবু। সুমি শিক্ষা ক্যাডারে আর খুশবু কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। দুই বোনের বাবা এয়াকুব মিয়া বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

তাদের বিষয়ে হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষক মোশারফ হোসেন জসিম বলেন, তারা দুই বোন আমাদের কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের এই ধারাবাহিক সাফল্যে উচ্ছ্বসিত।

আগের সংবাদটি পড়ুন… হাজীগঞ্জের দুই বোন বিসিএসে উত্তীর্ণ

গুলে জান্নাত বলেন, আমার শৈশব ও বেড়ে ওঠা চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে চট্রগ্রাম থেকে নিয়মিত ঢাকায় গিয়ে চাকরির পরীক্ষা দেওয়া কষ্টকর ছিল। তাই মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে ঢাকায় চলে যাই। সেখানে পরিবারের ওপর চাপ কমাতে এবং একইসঙ্গে স্বাবলম্বী হতে আঞ্জুমান মোখলেছুর রহমান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদে যোগ দিই। সেই সঙ্গে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন কোর্সে ভর্তি হয়ে শিক্ষাবিষয়ক পড়ালেখা শুরু করি। চাকরি করার পাশাপাশি বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি শুরু করি।

২০১৬ সালে প্রথম ৩৮তম বিসিএস দিয়ে আমার বিসিএস যাত্রা শুরু হয়। আশানুরূপ ফল না পেয়ে স্বপ্নপূরণের জন্য পুনরায় নতুন উদ্যোমে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি শুরু করি। এভাবে দেখতে দেখতে ৪০তম বিসিএসের ফলাফলের দিন চলে আসে। সেখানে নাম না দেখে হতাশায় ভেঙে পড়ি। এ বিসিএসের ফলাফলে নিজের রোল আছে নন-ক্যাডার তালিকায়। ৪০তম বিসিএস থেকেই নন-ক্যাডার নিয়োগে নতুন করে জটিলতা শুরু হলে আমারও শুরু হলো আর এক অসহনীয় কষ্টের যাত্রা। ভবিষ্যতের শঙ্কায় দিনের পর দিন উৎকণ্ঠা আর তার ফলে রাতের পর রাত কেটেছে নির্ঘুমে। চোখের জলও যেন মনে হচ্ছিল ফুরিয়ে যাচ্ছিল।

অবশেষে ৩ আগস্ট সারাদিন অপেক্ষার পর যখন ফলাফল তালিকায় দুই বোনের রোল নম্বর একইসঙ্গে দেখে স্তব্ধ হয়ে যাই। ২০১৬ সালে শুরু শুরু হওয়া বিসিএস’র স্বপ্ন ২০২৩ এসে তা পূর্ণতা পায়। এজন্য সর্বপ্রথম মহান আল্লাহতায়ালা ও পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞ।

জান্নাতুন নাঈম বলেন, ২০১১ সালে হাজীগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি, ২০১৩ সালে হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করি। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করি।

সারাবান তাহুরা শিফা

চাঁদপুর সদরের মেয়ে সারাবান তাহুরা শিফা। তিনিও বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে তৃতীয় হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। সদরের ১০ নম্বর লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের স্বনামধন্য সাদী মৌলভী বাড়ির শওকত আলী মিয়া ও মনোয়ারা বেগম মিনুর দ্বিতীয় সন্তান তিনি।

২০১১ সালে চাঁদপুর সদরের বহরিয়া নুরুল ইসলাম হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন শিফা।

এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে ৩.৭৪ সিজিপিএ নিয়ে সম্মান ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তর (৩.৭৫ সিজিপিএ) শেষ করেন। বতর্মানে তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান সারাবান তাহুরা শিফা। নিজের সাফল্যের প্রতিক্রিয়ায় শিফা বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে মানবসেবায় কাজ করতে চাই। দেশকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে চাই।

মেয়ের এই সাফল্যে খুশি শিফার বাবা-মাসহ গোটা বাড়ির স্বজনেরা।

মুমু পোদ্দার

জেলার ঐতিহ্যবাহী শিশু সংগঠন মতলব সূর্যমুখী কচি-কাঁচার মেলার সাবেক আহ্বায়ক মুমু পোদ্দার এবারের বিসিএসে সহকারী পরিচালক (কৃষি বিপণন) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। মুমু পোদ্দারের বাবা প্রয়াত খোকন পোদ্দার। মাতা চম্পা পোদ্দার। পেশায় একজন গৃহিণী।

মুমুর গ্রামের বাড়ি মতলব পৌরসভার বোয়ালিয়া। বর্তমানে মতলব সদরের মতলব বাজারস্থ কলাদীতে বসবাস করছেন।

মুমু পোদ্দার কচিকাঁচা প্রি-ক্যাডেট স্কুল থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় এ প্লাস ও মতলবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। ঢাকার হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ ৫ পেয়েছেন। পরবর্তীতে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেছেন।

মুমু পোদ্দার এ ফলাফলের জন্য সকলের কৃতজ্ঞতা, দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেছেন।

আয়েশা আক্তার লাবনী

স্বামীর প্রবল ইচ্ছে, অগাধ বিশ্বাস আর ভালোবাসায় সাফল্যের চূড়ায় লাবনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২-১৩ সেশনের ছাত্রী আয়েশা আক্তার লাবনী। স্বামীর অনুপ্রেরণায় সদ্য ঘোষিত ফলাফলে বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার উত্তর সিকিরচর গ্রামের সন্তান লাবনী। বাবা আবদুল খালেক মিজি ও মাতা তাসলিমা বেগম। পরিবারের দুই ভাই-বোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ তিনি। ছোট ভাই তাইজুল ইসলাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স বিভাগে অধ্যয়নরত।

লাবনী পড়ালেখা শুরু করেন নারায়ণগঞ্জের পাগলার আহসান উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। পড়াশোনার ফলাফল ছিল তার সবসময় চোখ ধাঁধানো। ২০০৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫। এরপর ভর্তি হন দনিয়া কলেজে। একাদশ শ্রেণিতেও ভালো ফলাফলের চেষ্টা অব্যাহত থাকে। ২০১১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়ে একই বোর্ডের অধীনে বৃত্তি পান লাবনী। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে ২০১৬ সালে স্নাতক ও ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০১১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের পূর্ব লালপুর গ্রামের নাজির সাহেবের বাড়ির মো. রফিকুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ ছেলে মো. ফকরুজ্জামান আরিফের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন আয়েশা আক্তার লাবনী। আরিফ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন। হাজারো ব্যস্ততায় সবসময় স্ত্রীকে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন তিনি।

স্বামীর অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে লাবনী বলেন, যেকোনো সফলতায় একজন বন্ধু পাশে থাকা দরকার। সেদিক থেকে আমি খুব ভাগ্যবতী। কারণ আমার স্বামী আগে আমার বন্ধু তারপর স্বামী। তার সবসময় বিশ্বাস ছিল একাডেমিক সফলতার পাশাপাশি বিসিএসে ভালো করতে পারব। তার এই বিশ্বাস আমার আত্মবিশ্বাসকে আরো বাড়িয়ে দিতো। আমার আজকের এই সফলতায় তার অবদান অনস্বীকার্য।

Editor and Publisher: Mohammad Abdul Qayyum Khan. Acting Editor: Saiful Islam Sifat. Executive Editor: Md. Masud Rana.

Editorial and Commercial Office: Bhuiyan Bhaban, (2nd Floor), Adjacent to Chandpur Government College, Chandpur. News Room: Medina Super Market (2nd Floor), Ramganj Road, Bishwa Road, Hajiganj, Chandpur.

প্রিন্ট করুন