স্মৃতি: ১ বঙ্গভবনে শহীদ জিয়ার স্মৃতিঃ আমি চট্টগ্রাম বিশবিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্ব বিভাগে আনার্স, এম এ করে, রাজশাহী বিশব্বিদ্যালয়ের অধীনে আই বি এস থেকে এমফিল ডিগ্রী করেছি। আমি যখন সবেমাত্র সমাজতত্ব বিভাগ থেকে অনার্স পাস করেছি, অনার্সে প্রথম হবার সুবাদে শহীদ রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে যাবার আমন্ত্রন পাই সারা দেশের অনেক ট্যালেন্ট ষ্টুডেন্টদের একজন হিসাবে।
আমি ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম বিশবিদ্যালয়ের (চাকসু) শামসুন নাহার হলে একবার জি এস পদে, একবার ভিপি পদে পূর্ন প্যনেলে নির্বাচন করেছিলাম। প্রেসিডেন্টের (আমার দলের নেতার) আমন্ত্রন পেয়ে আমার খুশী যেন আর ধরেনা। কি কথা বলব, আমার কথা শুনবেত? বলতে পারবোত? ইত্যাদি মনে মনে কত কথা যে ঠিক করে রিহার্সেল দিয়েছি কতবার। এটা ছিল আমার সেই সময়কার বিরল সৌভাগ্য।
আনার্স পরীক্ষা দিয়ে গ্রামের বাড়ীতে একটা গার্লস হাই স্কুলে নামে মাত্র বেতনে শিক্ষকতা করতে শুরু করেছিলাম (১৯৮০-১৯৮৪)। সেই সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পল্লীতে বিদ্যুতায়নের প্রকল্প শুরু করেছিলেন।
সৌভাগ্য বশতঃ আমি আমার এলাকায় বিদ্যুতায়ন এর জন্য Honorary Director হিসাবে মনোনিত হয়ে সমিতি গঠনের মাধ্যমে চাঁদপুর সদর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন বিদ্যুতায়নে দায়িত্ব পালন করছিলাম। (১৯৮০-১৯৮৪)। Rural Electrification Board এর তখনকার চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রিগেডিয়ার সবিহউদ্দিন আহমেদ। আমার নিজ এলাকা কুমড়াডুগিতে একটি substation হওয়ার কথা ছিল, আমি দেখেছি প্রেসিডেন্ট প্ললী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পের অধীনে কালিয়াকৈরে বিদ্যুৎ বিতণের জন্য একটি substation উদ্ভোধন করেছেন।
তাই মনে মনে আমার এলাকায় উনাকে নিমন্ত্রণ জানাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঐ ছোট বয়সে এটাও জানতামনা যে, একজন প্রেসিডেন্টকে এভাবে নিমন্ত্রন করা যায়না। যথা সময়ে বঙ্গভবনে আমরা সারিবদ্ধভাবে দাড়ানো। প্রেসিডেন্ট সবার সাথে হাত মিলিয়ে এগুচ্ছেন, এক সময়ে আমার দিকেও হাত বাড়ালেন, হাত না বাড়িয়ে আমি গড় গড় করে বলতে থাকলাম, “আমি রাশেদা বেগম হীরা, আমি কুমিল্লা হাজীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডাইরেক্টর, আপনি কালিয়াকৈর এর সাব ষ্টেশন উদ্ভোধন করেছেন, আপনাকে আমার এলাকার সাবষ্টেশন উদ্ভোধনে যেতে হবে”।
আমার এত বড় বাক্য শেষ হবার আগেই তিনি তিন জনকে ছাড়িয়ে চলে যাচ্ছেন। খুব অপমান বোধ করলাম এক রকম চিৎকার করে বললাম আপনি আমার কথা শুনছেননা কেন? উনি আবার ফিরে এলেন আমার সামনে বললেন, কি বলছিলি? আমার লজ্জাও লাগছিল হাসিও পাচ্ছিল। হেঁসে হেঁসে পুরা কথা গুলু আবার বললাম। একটু মুচকী হাসি দিয়ে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, “তুই কি করে ডাইরেক্টর হলি?” আমি কেমন একটা অনুতাপ, আনন্দ, তৃপ্তিতে প্রায় বাক রুদ্ধ হয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল গানের সেই কয়েকটি লাইন “আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কি শর্তে? রাজা সবাইকে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান, মোদের খাট করে রাখেননিত কোন অসত্যে, নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কি শর্তে? আমরা সবাই রাজা”।
স্মৃতি-২ রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়ার আমন্ত্রনে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে হিজবুল বাহার নামক জাহাজে সমুদ্র ভ্রমনঃ হিজবুল বাহারে Student Representative হিসাবে আমার বক্তব্য নেতার খুব পছন্দ হয়েছিল। আমি জিনাত রেহেনার একটা গান ” সাগরের তীর থেকে, মিষ্টী কিছু হাওয়া এনে, তোমার কপালে ছোয়াবো গো ভাবি মনে মনে” চার লাইন গেয়ে বক্তব্য শুরু করেছিলাম। মূলত আমি বলেছিলাম, সেখানে প্রত্যেকটা সেমিনারে যতজন বক্তব্য রেখেছেন কেউ কেন জানি আমাদের কেন নিয়ে এলেন এবিষয়ে কেউ কিছুই বলেননি।
আমরা ছাত্র ছাত্রীরা অমাদের করনীয় বিষয়ে জানতে চাই। কারন, আমরা চাইনা এই রকম একটা ব্যয় বহল ভ্রমন শোধুই বিনোদন মূলক হউক। তার পরের দিন দেখলাম শহীদ রাষ্ট্রপতি সমস্ত ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বক্তব্য রাখবেন। তিনি এলেন চেয়ারে নয়, একটি কাঠের টেবিলে পা ঝুলিয়ে বসলেন। আমরা আনেক ছাত্র ছাত্রী পাটাতনে বসে মন্ত্র মুগ্ধের মত শুনছি তার কথা। তিনি বলেন, আমি আজ বলবো কেন তোমাদের নিয়ে এলাম সাগর দেখাতে।
তোমাদের আমি পাহাড় দেখাতেও নিয়ে যাবো। তোমরা কি জান এই সাগরের নীচে তোমাদের দেশের মানচিত্রের চেয়ে বড় ভূখন্ড আছে। তোমরা কি জান, তোমাদের সমুদ্রের ভিতরে ঢুকে অন্য দেশের মানুষ তাদের বর্জ তোমাদের সমুদ্রে ফেলে তোমাদের পানিকে দূষিত করে দিচ্ছে, তোমাদের সীমানায় এসে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তোমারা কি জানো তোমাদের মাটির নীচে আছে বিপুল সম্ভাবনা। তোমারা যদি সচেতন না হও অন্য দেশের মানুষ তোমাদের গ্যাস, তেল তুলতে না দিয়ে সীলগালা করে দিয়ে যাবে।
তোমাদের জানতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে। এই যে অনেক তরুন মেধাবী আসেনি তারা বই এর পোকা তাদের দিয়ে দেশের কিচ্ছু হবেনা। আমাদের দেশের অনেক মেধাবীরা বিদেেেশা অনেক কিছু আবিস্কার করছে। আমি অদের ফিরিয়ে আনবো। আমাদের ব্রেইন ড্রেন হচ্ছে। তোমরা কি জানো বাংলা দেশ একটা লেপ এখানে পা ঢাকলে মাথ খালি হয়ে যায়, মাথা ঢাকলে পা খালি হয়ে যায়। আমি অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধটার কথা বলছি।
তোমারা যারা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়ছ তারা এত কম টাকায় কিভাবে পড়তে পারছ? কারন এখানে একজন কৃষকেরও আয়ের অংশ ব্যয় করা হচ্ছে। তাই তাদের জন্য তোমাদে আরো আবদান রাখতে হবে। দেশ তোমাকে কি দিল এইটি সব চাইতে বড় কথা নয়। দেশকে তুমি কি দিলা সেইটিই সব চাইতে বড় কথা।
আমার জীবনের শখ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। এমফিল করার পর রাজসাহী ইউনিভাসিটিতে একটা সুযোগো এসেছিল। কিন্তু এই বক্তব্য শুনার পর থেকে দেশের জন্য কিছু করা ছাড়া আর কিছুকেই বড় বলে মনে হয়নি।
স্মৃতি-৩: ১৫-১৭ এপ্রিল ১৯৮১ সালে নেপালে রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং মা খালেদা জিয়ার সফর সংগী হিসাবে আমার স্মৃতির কথা অন্য আরেক দিন লিখবো। এত দীর্ঘ লিখা পড়তে ধৈর্য্য বিচ্যুতি ঘটবে তাই। কিন্তু আমার স্মৃতিতে প্রতিটি মহুর্ত রয়েছে স্মৃতির এক সমৃদ্ধ ভান্ডার হিসাবে। শুধু এই কথা মনে হয় আমি একজন অতুলনীয় অভিভাবক হারিয়েছি। মহান আল্লাহ যেন এই মহান সাধারণের বেশে অসাধারণ মানুষটিকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করেন।
তার উত্তরসূরী তারেক রহমানকে যেন তার সকল অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সুযোগ দান করুন। মহান রব যেন শহীদ জিয়া এবং বেগম খলেদাজিয়ার সন্তান তারেক রহমানকে তার খাস নিরাপত্তার বেষ্টনীর মধ্যে রেখে দীর্ঘ আয়ু দান করেন। আমিন।
লেখক পরিচিত :
আলহাজ্ব রাশেদা বেগম হীরা
চাঁদপুরের কৃতিসন্তান দু-বারের মহিলা এমপি বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক ও বিএনপির উপদেষ্টা।