রাজনীতির প্রাণ ত্যাগী কর্মীরা, নাকি কেবল প্রভাবশালীরা?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ত্যাগী ও মাঠের কর্মীদের মূল্যায়ন সবসময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। কারণ রাজনীতি শুধু ক্ষমতা, পদ-পদবি কিংবা প্রভাবের নাম নয়— এটি মানুষের বিশ্বাস, দীর্ঘ সংগ্রাম আর অসংখ্য ত্যাগের গল্প।

রাজনীতির বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, একজন প্রকৃত কর্মীর পথ কতটা কঠিন। দুঃসময়ে দলের পাশে থাকা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠ না ছাড়া, মামলা-হামলা কিংবা ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া— এগুলো কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ নয়, বরং এক ধরনের আত্মত্যাগ।

আমার খুব কাছ থেকে দেখা একজন মানুষ আছেন, যিনি দলের কঠিন সময়গুলোতে কখনও পিছিয়ে যাননি। যখন রাজনৈতিক পরিচয়ই অনেকের জন্য ভয়, চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণ ছিল, তখনও তিনি মানুষের পাশে থেকেছেন। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় নির্বাচন করেছেন, মানুষের ভালোবাসা ও বিপুল সমর্থনে দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

কিন্তু সেই সময়গুলো মোটেও সহজ ছিল না। দিনের পর দিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, রাজনৈতিক চাপ, মামলা-হামলার আতঙ্ক, নির্বাচন এলেই এলাকায় সন্ত্রাসীদের মহড়া— এসবই ছিল বাস্তবতা। তবুও তিনি রাজনীতিকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব হিসেবেই নিয়েছেন।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক সময় মনে হয়, রাজনীতির মূল দর্শন যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ত্যাগ, আদর্শ ও জনসম্পৃক্ততার চেয়ে অর্থ ও প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান সেই মানুষগুলো, যারা বছরের পর বছর নিঃস্বার্থভাবে সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন। কারণ একজন প্রকৃত কর্মীর কাছে রাজনীতি কেবল পরিচয় নয়— এটি আবেগ, আত্মত্যাগ এবং জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলোর একটি।
ইতিহাস বলছে, যখন রাজনীতি ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের হাত থেকে সরে গিয়ে সুবিধাবাদী কিংবা শুধুমাত্র প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্ব তৈরি হয়। আর সেই দূরত্ব কোনো দল কিংবা গণতন্ত্রের জন্যই শুভ নয়।
একটি রাজনৈতিক দল তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন সেখানে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও জনভিত্তিসম্পন্ন মানুষদের সম্মান দেওয়া হয়। কারণ মাঠের কর্মীরাই একটি দলের আসল শক্তি, সংকটের সময়ের ভরসা এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগের সবচেয়ে বড় সেতুবন্ধন।
রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের আস্থা, আদর্শ ও দায়িত্ববোধের জায়গা। কারণ শেষ পর্যন্ত জনগণ সবকিছুই দেখে, মনে রাখে এবং সময়মতো তার মূল্যায়নও করে।
লেখক : শাহরিয়ার জামান তনয়








