মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

ফরিদগঞ্জে প্রবাসীর বসতঘর ভস্মীভূত, সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা অসহায় পরিবার

এস. এম ইকবাল প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৩ পিএম
ফরিদগঞ্জে প্রবাসীর বসতঘর ভস্মীভূত, সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা অসহায় পরিবার

ফরিদগঞ্জে মধ্যরাতে অগ্নিকাণ্ডে বসতঘর হারিয়ে দুই অবুঝ সন্তানকে কোলে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কাঁদছেন পপি বেগম।

জীবিকার তাগিদে বছরখানেক আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন স্বামী মো. রিয়াদ হোসেন। কিন্তু সেখানে ইকামা (বৈধ কাগজপত্র) না থাকায় ঠিকমতো মিলছিল না কাজ। দেশে থাকা স্ত্রী পপি বেগমও ধারদেনা করে দুই অবুঝ সন্তানের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে অতি কষ্টে গড়ে তুলেছিলেন একটি ছোট বসতঘর। কিন্তু এক রাতের বিধ্বংসী আগুন মুহূর্তেই ভস্মীভূত করে দিল সেই শেষ সম্বল। দুই নিষ্পাপ শিশুকে নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটছে পপি বেগমের।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) গভীর রাত আনুমানিক ১টার দিকে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের দক্ষিণ ধানুয়া গ্রামের ‘খাসের বাড়িতে’ এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সোমবার রাতে দুই সন্তানকে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়েন পপি বেগম। রাত ১টার দিকে ঘরের চারদিকে আগুনের প্রচণ্ড তাপে ও ধোঁয়ায় তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরা পরনের সামান্য কাপড়টুকু সম্বল করে দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে কোনোমতে ঘর থেকে বের হয়ে প্রাণ রক্ষা করেন তিনি।
তাঁদের ডাকচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান এবং ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। তবে মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটি পুরো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘরের আসবাবপত্র, শিশুসন্তানের স্কুলের বইপত্র ও জমানো সব টাকা ভস্মীভূত হয়।
হাউমাউ করে কেঁদে পপি বেগম বলেন, আমার ৭ বছরের মেয়ে ফাতেমা আর ৩ বছরের ছেলে ফারাজকে নিয়ে রাতে ঘুমে আছিলাম। হঠাৎ আগুনের আঁচে ঘুম ভাঙলে সন্তানদের কোলে নিয়া ঘরের বাইরে এক কাপড়ে ভাইগ্যা বের হই। স্থানীয় মানুষ আর ফায়ার সার্ভিস আইসা আগুন নিভানের চেষ্টা করলেও কিচ্ছু বাঁচানো যায় নাই। আমার স্বামী সৌদিতে অবৈধ হইয়া পড়ায় কাজকর্মে আয়-রোজগার নাই। শিশু বাচ্চাদের নিয়া এখন কই যামু, কী খামু-কিছুই ভাইবা পাচ্ছি না।
ফরিদগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মো. কামরুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ঘরটির সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
স্থানীয় গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম শেখ বলেন, পরিবারটি মারাত্মক আর্থিক অনটনের মধ্যে রয়েছে। আগুনে নতুন তৈরি করা ঘরটি পুড়ে যাওয়ায় তারা এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। ইউপি পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা তাৎক্ষণিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করছি। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এই অসহায় পরিবারটির পুনর্বাসনে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।
অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক জানান, অগ্নিকাণ্ডে ঘর পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপাতত জরুরি শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। লিখিত আবেদন পাওয়ার পর তাদের ঘর পুনর্নির্মাণে সরকারি ঢেউটিন ও অনুদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা চাঁদপুরের ডিসি, সেরা তিন ইউএনও

মাঈনুল ইসলাম প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৬ এম
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা চাঁদপুরের ডিসি, সেরা তিন ইউএনও

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে জাতীয় পর্যায়ে সেরা জেলা প্রশাসক নির্বাচিত হয়েছেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান। একই কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বীকৃতিও পেয়েছেন চাঁদপুরের তিন কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা, দ্বিতীয় হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং তৃতীয় শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমের মূল্যায়নে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, নিবন্ধনের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ এ সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় চাঁদপুরের এ অর্জন জেলার প্রশাসনিক অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সেবার মান উন্নয়নে পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ের গুরুত্ব এ সাফল্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ, বিশেষ উদ্যোগে সাফল্য

Model Hospital

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে অগ্রগতি আনতে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও শাহরাস্তি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা।

তাঁরা জানান, গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে জন্ম ও মৃত্যু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে যুক্ত কর্মী, টিকাদান কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়েছে। যেসব শিশুর জন্ম নিবন্ধন তখনো হয়নি, তাদের শনাক্ত করে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধন যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য বাড়ি বাড়ি যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিবন্ধন কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁদের ভাষ্য, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।

প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির ওপর জোর

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, আগের মাসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে চাঁদপুর কিছুটা পিছিয়ে ছিল। পরে কার্যক্রমের গতি বাড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও গ্রাম পুলিশের সদস্যদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি বলেন, আগে যেসব জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন আটকে ছিল কিংবা বিভিন্ন কারণে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি, সেগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ ও টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কেউ যেন নিবন্ধনের বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিনের কাজের বিবরণ নেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ তথ্যনির্ভর ও সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা থেকেই এ সাফল্য এসেছে বলে তিনি মনে করেন।

অভিনন্দন জানিয়েছে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এ অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী ও সাধারণ সম্পাদক এম এ লতিফ।

এক অভিনন্দন বার্তায় তাঁরা বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় এ অর্জন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা, জনবান্ধব উদ্যোগ এবং সেবামুখী কার্যক্রম চাঁদপুরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জেলার নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্তভাবে সরকারি সেবা পাবেন।

সেবায় সন্তুষ্টির কথা জানালেন স্থানীয়রা

চাঁদপুরের কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা নিয়মিত নাগরিক সেবা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। কোনো সমস্যা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও সমাধান পাওয়ার কথা বলেছেন কেউ কেউ।

তবে সেবার এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলেও মনে করেন তাঁরা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে চাঁদপুরের এ অর্জনকে নাগরিক সেবার উন্নয়নে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, সমন্বিত উদ্যোগ ও নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও জেলার অন্যান্য সরকারি সেবায় এমন সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।