শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

মতলব উত্তরে ৬১ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ‘বাড়তি বোঝা’

মনিরুল ইসলাম মনির প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৩, ৮:২০ পিএম
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ‘বাড়তি বোঝা’

মতলব উত্তর উপজেলার ১৮০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৩৫ শিক্ষকের পদ শূন্য। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে প্রায় ৬১টি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। এতে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা (রাজস্ব খাত ও জাতীয়করণ ঘোষিত মিলে) ১৮০টি। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৬১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। একই সঙ্গে এসব বিদ্যালয়ে ৭৪টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকবিহীন বিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষকেরা।

বিভিন্ন বিদ্যালয়ের কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব তাঁদের কাছে বাড়তি বোঝা। তাঁদের অভিযোগ, সব সময় তাঁদের দাপ্তরিক কাজে নানা তথ্য দিতে এবং উপজেলা পর্যায়ে সভায় যোগ দিতে ছোটাছুটি করতে হয়। অথচ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারিভাবে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।

Model Hospital

আবার যেসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য আছে, সেসব বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ সামলানোর পাশাপাশি পরীক্ষার খাতা দেখাসহ নানা কাজে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন ভূঁঞা অবসরে গেলে এই পদটি শূণ্য হয়। এরপর সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। উপজেলায় ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নে ১৮০টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূণ্য রয়েছে।

এই বিদ্যালয় গুলোতে সহকারীরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছে দীর্ঘদিন ধরে। কোন কোন বিদ্যালয়ে প্রায় এক যুগ পার হলেও এখন পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ হয়নি। তবে শিক্ষা অফিসার ও বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদানে কোনো সমস্যা হচ্ছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অভিভাবক নাছির উদ্দিন, হাসান আলী, একরামুল ইসলাম, আজিজার রহমানসহ অনেকে অভিভাবকরা বলেন, শিশুদের লেখাপড়া শেখার জন্য প্রথম ধাপ প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু উপজেলার বেশ কিছু বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকায় কিছু শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতায় অনেক বিদ্যলায় পাঠদানের সুনাম হারাতে বসেছে। যার কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের প্রাইভেট স্কুলগুলোতে ভর্তি করে দেয়। এমনকি প্রধান শিক্ষক না থাকায় ওই সব স্কুলগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে সুষ্ঠু পরিবেশ ভেঙে পড়ে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কর্মক্রম।

আরও অনেক অভিভাবকরা জানান, উপজেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষাদান ও সুষ্ঠু পাঠদানের পরিবেশ ফিবিয়ে আনতে হলে প্রধান শিক্ষকবিহীন এসব বিদ্যালয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। আর তা না হলে দিন দিন উপজেলার প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠদান চরমভাবে ব্যাহত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, যখন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন শিক্ষক সংকট রেখেই কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রদান করেন। আবার দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি বন্ধ থাকায় সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদের কাঁধেই ভারপ্রাপ্তের ভার পড়ছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনকালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা সরকারি তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না।

অন্যদিকে অফিসের বিভিন্ন নিদের্শনা অনুযায়ী ভারপ্রাপ্তদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়। এতে বিদ্যালয়ে পাঠদানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রুত জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

এ ব্যাপারে মতলব উত্তর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে কয়েকবার প্রধান শিক্ষকবিহীন বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারিভাবে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়েই চালানো হচ্ছে বিদ্যালয়গুলো।

তবে তিনি দাবি করেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসের নজরদারি থাকায় প্রধান শিক্ষকবিহীন ওইসব বিদ্যালয়ে পাঠদানের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’