মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

ইউএনও মনিরা খাতুনের হস্তক্ষেপে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেন ৮০ বছরের জয়নব

মোঃ মাসুদ রানা প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৩ এম
ইউএনও মনিরা খাতুনের হস্তক্ষেপে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলেন ৮০ বছরের জয়নব
ছয় ছেলে ও চার মেয়ের মা ৮০ বছরের জয়নব বানু। জীবনের শেষ সময়ে তাঁর চাওয়া, মরহুম স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় ছোট্ট একটি ঘর করে দিলে সেখানেই বাকি জীবন কাটাবেন। কিন্তু ১০ সন্তান থাকা সত্ত্বেও স্থায়ী আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছিল তাঁর। এমন পরিস্থিতিতে বৃদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছেন শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার  (ইউএনও) মনিরা খাতুন। আপাতত দুই মাসের জন্য ছেলের বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তবে স্থায়ী আশ্রয়ের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি জয়নবের।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউপির কাদরা পূর্বপাড়ায় সৈয়দ আহম্মেদের বাড়িতে গিয়ে জয়নব বানুর খোঁজখবর নেন ইউএনও। পরে তাঁকে নিয়ে ছেলে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে যান। আনোয়ার সৌদি আরবপ্রবাসী। তাঁর স্ত্রী হাজেরা বেগমের তত্ত্বাবধানে আপাতত দুই মাস বৃদ্ধার থাকার ব্যবস্থা করে দেন ইউএনও। জয়নব বানু জানান, তিনি স্বামীর ভিটা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চান না। ছেলেরা সেখানে একটি দুচালা ঘর করে দিলে পরিচিত পরিবেশেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে পারবেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার বাড়িতে ফিরে ছেলে মনির হোসেনের ঘরের দরজায় সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বসে ছিলেন জয়নব। সেখানে থাকার ব্যবস্থা না হওয়ায় একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ঘোরাফেরা করতে থাকেন। পরে এক পথচারী তাঁর পরিচয় জেনে একই গ্রামের বাসিন্দা ঝরণা খাতুনের বাড়িতে পৌঁছে দেন। সেখানে চার দিন থাকার পর বিষয়টি ইউএনওর নজরে আসে। এরপরই বৃদ্ধার সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেন তিনি।জয়নবের স্বামী সৈয়দ আহম্মেদ ১৯৯৮ সালে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর সময় তাঁর ছোট ছেলে ঈমাম হোসেন মায়ের গর্ভে সাত মাসের সন্তান ছিলেন। ছয় ছেলের মধ্যে বড় ছেলে শাহাজাহান শারীরিক প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় ছেলে আবুল কাসেম দেশে ট্রাক চালান। অন্য ছেলেদের মধ্যে আনোয়ার, আনিছুর রহমান, মনির ও ঈমাম সৌদি আরবপ্রবাসী। চার মেয়ের মধ্যে কয়েকজন একই এলাকায় বসবাস করেন।
ইউএনও মনিরা খাতুন বলেন, বার্ধক্যে একজন মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, যত্ন ও সম্মান পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। জয়নব বানুর পরিস্থিতি জানার পর তাঁর আপাতত থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার পথ খুঁজে দেখা হবে। নিরাপদ আবাসনে সর্বাত্মক  ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুই মাসের আশ্রয় মিললেও এরপর কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন জয়নব বানুর। স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটায় একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে দেওয়াই এখন তাঁর প্রত্যাশা। এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সম্পত্তির অবস্থা ও স্থায়ী আবাসন না হওয়ার কারণও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে পারিবারিক বিরোধ বা কারও দায় সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ইউএনওর প্রশংসনীয়  উদ্যোগে আশ্রয় নিশ্চিত হলেও জয়নবের স্থায়ী আবাসনের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত বলে স্থানীয়রা মনে করছেন । এখন স্থানীয়রা জয়নবের  তাঁর প্রত্যাশা, স্বামীর ভিটায় ছোট্ট একটি ঘর হবে, যেখানে জীবনের শেষ দিনগুলো নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে কাটাতে পারবেন তিনি ।

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা চাঁদপুরের ডিসি, সেরা তিন ইউএনও

মাঈনুল ইসলাম প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৬ এম
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা চাঁদপুরের ডিসি, সেরা তিন ইউএনও

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে জাতীয় পর্যায়ে সেরা জেলা প্রশাসক নির্বাচিত হয়েছেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান। একই কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বীকৃতিও পেয়েছেন চাঁদপুরের তিন কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা, দ্বিতীয় হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং তৃতীয় শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমের মূল্যায়নে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, নিবন্ধনের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ এ সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় চাঁদপুরের এ অর্জন জেলার প্রশাসনিক অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সেবার মান উন্নয়নে পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ের গুরুত্ব এ সাফল্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ, বিশেষ উদ্যোগে সাফল্য

Model Hospital

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে অগ্রগতি আনতে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও শাহরাস্তি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা।

তাঁরা জানান, গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে জন্ম ও মৃত্যু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে যুক্ত কর্মী, টিকাদান কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়েছে। যেসব শিশুর জন্ম নিবন্ধন তখনো হয়নি, তাদের শনাক্ত করে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধন যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য বাড়ি বাড়ি যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিবন্ধন কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁদের ভাষ্য, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।

প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির ওপর জোর

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, আগের মাসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে চাঁদপুর কিছুটা পিছিয়ে ছিল। পরে কার্যক্রমের গতি বাড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও গ্রাম পুলিশের সদস্যদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি বলেন, আগে যেসব জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন আটকে ছিল কিংবা বিভিন্ন কারণে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি, সেগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ ও টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কেউ যেন নিবন্ধনের বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিনের কাজের বিবরণ নেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ তথ্যনির্ভর ও সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা থেকেই এ সাফল্য এসেছে বলে তিনি মনে করেন।

অভিনন্দন জানিয়েছে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এ অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী ও সাধারণ সম্পাদক এম এ লতিফ।

এক অভিনন্দন বার্তায় তাঁরা বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় এ অর্জন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা, জনবান্ধব উদ্যোগ এবং সেবামুখী কার্যক্রম চাঁদপুরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জেলার নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্তভাবে সরকারি সেবা পাবেন।

সেবায় সন্তুষ্টির কথা জানালেন স্থানীয়রা

চাঁদপুরের কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা নিয়মিত নাগরিক সেবা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। কোনো সমস্যা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও সমাধান পাওয়ার কথা বলেছেন কেউ কেউ।

তবে সেবার এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলেও মনে করেন তাঁরা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে চাঁদপুরের এ অর্জনকে নাগরিক সেবার উন্নয়নে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, সমন্বিত উদ্যোগ ও নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও জেলার অন্যান্য সরকারি সেবায় এমন সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।