শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদপুরে ফের বাবার মৃতদেহ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষা দিলেন হতভাগা মেয়ে

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১০ মে, ২০২৩, ৭:০০ পিএম
চাঁদপুরে ফের বাবার মৃতদেহ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষা দিলেন হতভাগা মেয়ে
সারাদেশে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত ৩০ এপ্রিল রবিবার। সব শিক্ষার্থী প্রতিদিন মা-বাবার দোয়া নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসে। কিন্তু বাড়িতে বাবার লাশ রেখে চোখে জল নিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিতে এসেছে সুমাইয়া আক্তার নামে এক ছাত্রী। ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুর সদর উপজেলার ৬নং মৈশাদী ইউনিয়নের দক্ষিণ হামানকর্দ্দি গ্রামে। বুধবার (১০ মে) সকাল ৬টার দিকে সুমাইয়া আক্তারের বাবা মোহাম্মদ মিজান গাজী (৪৫) উচ্চ রক্তচাপ হয়ে মারা যান। এদিন সকাল ১০টায় পরীক্ষায় অংশ নেন সুমাইয়া। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে এসে বাবার শেষ বিদায় দেন সে।
মোহাম্মদ মিজান গাজী দক্ষিণ হামানকর্দ্দি নদীর পাড় সংলগ্ন গাজী বাড়ির বাসিন্দা। সুমাইয়া আক্তার চাঁদপুর সদর উপজেলার মৈশাদী ইউনিয়নের হামানকর্দ্দি পল্লী মঙ্গল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। বুধবার তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। এদিন সকালে বাবা মারা যাওয়ায় ভেঙে পড়ে সুমাইয়া। পরে স্বজনদের পরামর্শে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। এক হাতে চোখের জল মুছে আর অন্য হাতে কলম চালিয়ে পরীক্ষা দেয় সুমাইয়া আক্তার।
স্থানীয়রা জানায়, বুধবার সকাল ৬টার দিকে স্ট্রোক করে মারা যান সুমাইয়া আক্তারের বাবা মোহাম্মদ মিজান গাজী। বাবাকে হারিয়ে ভেঙে পড়ে এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সুমাইয়া। বাবার মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাওয়া সুমাইয়ার পক্ষে পরীক্ষা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এসময় তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা তাকে বুঝিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পাঠায় এবং সে বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষা শেষে বাড়ি পৌঁছার পর তার বাবার লাশ বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ বিষয়ে মৈশাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ নুরুল ইসলাম পাটওয়ারী বলেন, মৃত মোহাম্মদ মিজান গাজী গতকালও ভালো ছিল। আজ সকালে হঠাৎ করে পাতলা পায়খানা শুরু হলে মতলব আইসিডিডিআরবির হাসপাতালে নেয়ার পর ওখানেই স্ট্রোক করে মৃত্যবরন করেন। সকালে তিনি মৃত্যুবরণ করলে তার মেয়েকে পরিবারের সবাই বুঝিয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে বলে। সবার কথায় সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। মেয়ের পড়ালেখার সুবিধার্থে আমরা উক্ত পরিবারটির পাশে থাকতে চেষ্টা করবো। সামনে যাতে সবগুলো পরীক্ষায় সে অংশগ্রহণ করে সেজন্য আমরা তাকে সহযোগিতা করবো। আমি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩ মে বুধবার চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহাতলী জোবাইদা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ছাত্রী ফেরদৌসী আক্তার জুঁহিও তার বাবার লাশ বাড়িতে রেখে উপজেলার এম এম নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে আসেন। সে শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের ভাটেরগাঁও গ্রামের বেপারী বাড়ির মুকবুল হোসেন এর মেয়ে। মকবুল হোসেন ঐদিন সকাল ৬টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরন করেন এবং একইদিন বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এই এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই রকম দুটি ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বমহলে দেখা দিয়েছে এক কস্টের নিরবতা।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’