বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

ভুল ওষুধে শিশুর জীবন ঝুঁকিতে

হাজীগঞ্জে কেমিস্টের ‘প্রেসক্রিপশন কেলেঙ্কারি’ নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০২৫, ৯:৫৭ পিএম
হাজীগঞ্জে কেমিস্টের ‘প্রেসক্রিপশন কেলেঙ্কারি’ নিয়ে তোলপাড়

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার বাকিলা বাজারে ভুল ওষুধ সেবনের কারণে এক ১২ বছরের শিশুর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সেনা ক্যাম্প এবং হাজীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৭ জুলাই সকালে রাধাসার (পাঠানবাড়ী) এলাকার মোঃ আরাফাত পাঠান নামে এক শিশু জ্বরে আক্রান্ত হলে তার মা মোসাঃ জান্নাত আক্তার তাকে নিয়ে বাকিলা বাজারের ‘শুভ মেডিকেল হল’-এ যান। ওষুধ দোকানটির মালিক গৌতম কুমার দাস একজন কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট হলেও নিয়মিত নিজ হাতে প্রেসক্রিপশন দিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।

এদিন তিনিও শিশুর জন্য প্রেসক্রিপশন লিখে নিজ দোকান থেকেই ওষুধ সরবরাহ করেন। ওষুধ সেবনের কিছুক্ষণ পরই শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তার চোখ বাঁকা হয়ে যায়, জিহ্বা বেরিয়ে আসে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

তড়িঘড়ি করে তাকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে শিশুটিকে কুমিল্লা মুন হাসপাতাল, গ্রীনলাইফ হাসপাতালসহ পাঁচটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।

Model Hospital

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে যে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তা মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ব্যবহৃত মানসিক রোগের ওষুধ। এই ওষুধ শিশুদের শরীরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এতে তার স্নায়ুবিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসা বাবদ পরিবারটির প্রায় দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে।

ভুক্তভোগী শিশুর চাচা ও সিঙ্গাপুরপ্রবাসী শাহাদাত পাঠান বলেন, “আমার ভাতিজা শুধু জ্বরে ভুগছিল। অথচ তাকে দেওয়া হলো পাগলের ওষুধ! ওষুধ খাওয়ার পর সে পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে। এক হাসপাতাল থেকে আরেকটায় দৌড়েছি, ওর চোখ-মুখ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্ষতিপূরণের কথা বলতেই অভিযুক্ত গৌতম কুমার দাস ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পরিবারকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন।

অভিযুক্ত গৌতম কুমার দাস বলেন, “আমার জায়গা থেকে এই চিকিৎসা দেওয়া ঠিক হয়নি। ভুল হয়ে গেছে।”

এ বিষয়ে হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আহমেদ তানভীর বলেন, “এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে আমি যে প্রেসক্রিপশন দেখেছি, সেটি শিশুদের জন্য একেবারেই উপযোগী নয়। এটি মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ওষুধ, যা খুব সাবধানে ও অভিজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া কেউ লিখতে পারে না। একজন কেমিস্ট কীভাবে প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন, সেটাও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।”

হাজীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, “অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইবনে আল জাহিদ হোসেন বলেন, “বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষী প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ভুক্তভোগী পরিবার প্রশাসনের কাছে চিকিৎসার যাবতীয় কাগজপত্র, প্রেসক্রিপশন ও বিল সংযুক্ত করে অভিযোগ জমা দিয়েছেন এবং অভিযুক্ত গৌতম কুমার দাসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর চিকিৎসায় চিকিৎসক-নার্স ও SACMOদের সমন্বিত উদ্যোগ

শাহরাস্তিতে প্রথম জরুরি বিভাগেই সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম

মোঃ মাসুদ রানা প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৬ এম
শাহরাস্তিতে প্রথম জরুরি বিভাগেই সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো জরুরি বিভাগেই সাপের কামড়ে আক্রান্ত এক রোগীকে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (ASV) দেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাতে সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণীর শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসক, নার্স ও SACMOদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় জরুরি বিভাগেই শুরু হয় চিকিৎসা। পরে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোগী আসমা আক্তার (২৩) উপজেলার মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী আল-আমীন।
বুধবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে নিজ বাড়িতে সাপের কামড়ের শিকার হন আসমা। স্বজনরা দ্রুত তাঁকে রাত ৯টার দিকে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। ওই সময় তিনি প্রায় আট সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নুরুন নবী জুয়েল তাঁকে পরীক্ষা করেন।
এ সময় কামড়ের স্থান ফোলা ও কালচে হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রোগীর শরীরে সাপের বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায়। তাঁর চোখের পাতা ঝুলে পড়া (Ptosis) এবং ‘Broken Neck Sign’-এর মতো লক্ষণও প্রকাশ পায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসক দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে জরুরি বিভাগেই অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়া শুরু হয়। চিকিৎসা পর্যায়ে রোগীকে মোট ১০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়।
চিকিৎসা চলাকালে রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন চিকিৎসক, নার্স ও SACMOরা। চিকিৎসার পর তাঁর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে পরবর্তী ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UHFPO) ডা. মো. আবু নাছের শাকিল বলেন, “জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে-কাটা কোনো রোগীকে জরুরি বিভাগেই অ্যান্টিভেনম দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। বিশেষ করে রোগীটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। দ্রুত হাসপাতালে আনা এবং বিষক্রিয়ার লক্ষণ শনাক্ত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হওয়ায় জরুরি ব্যবস্থাপনা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, সাপের কামড়ের পর সময় নষ্ট না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। স্থানীয়ভাবে ঝাড়ফুঁক বা অন্য কোনো প্রচলিত পদ্ধতিতে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
উল্লেখ্য, সময়ের সঙ্গে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবার পরিধিও বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  বেগম খালেদা জিয়ার সময় হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শাহরাস্তিতে আগমন উপলক্ষে সম্প্রতি  হাসপাতালটি ৫১ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় এবং পরে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ জন স্থানীয় সাংসদ লায়ন ইন্জিঃ মমিনুল হক এমপি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনিরা খাতুনকে  সবাই ধন্যবাদ জানান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মনে করছে, জরুরি বিভাগে সাপে-কাটা রোগীর অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের এই ঘটনা স্থানীয় মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও বার্তা ।
একজন অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর সংকটময় সময়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হওয়ার ঘটনাটি সেই সক্ষমতারই একটি মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।