শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

শাহরাস্তির মেয়ে কুমিল্লায় স্বাবলম্বী হওয়ার সংগ্রামী গল্প

মো. মাসুদ হোসেন প্রকাশিত: রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৯:১১ পিএম
শাহরাস্তির মেয়ে কুমিল্লায় স্বাবলম্বী হওয়ার সংগ্রামী গল্প
বিশ্বের উন্নত দেশের ন্যায় আমাদের দেশেও পুরুষের পাশাপাশি নারীদের ভূমিকা অতুলনীয়। পিছিয়ে নেই সমাজের অনেক অসহায় নারীরা। অন্যের উপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে তাঁরা আজ দায়িত্ব নিতে শিখেছে নিজের এবং পরিবারের। তেমনই একজন চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার খাদিজা আক্তার।
উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা খাদিজা আজ কুমিল্লা শহরে বসেই মেটাচ্ছেন পরিবারের চাহিদা। এটা করতে নেই, এভাবে বসতে নেই, ওভাবে চলতে নেই এমন নিয়মনীতির বেড়াজাল ভেঙ্গে খাদিজা আজ পৌঁছেছে আমিত্বের উচ্চ শিখরে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছে উদ্যোক্তা। আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি সৃষ্টি করছে অন্যের কর্ম সংস্থানেরও। ২০১৯ সালে শুরু করা অফলাইনের পাশাপাশি তিনি আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে অনলাইনেও।
নিজ এলাকার বেরনাইয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে এসএসসি ও ২০১৪ সালে শাহ শরীফ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে আনসার ভিডিপি ট্রেনিং এর উদ্দেশ্য চলে যান কুমিল্লায়। পরে নিজের খরচ মেটানোর জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি করেন। সেখানেই এক পছন্দের ছেলেকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন ২০১৬ সালে। বিয়ের পরেও নিজ খরচে চালিয়ে নেন পড়াশোনা। সেই খরচ বহনে শুরু করে দেন টিউশনি করা। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে জন্ম দেন একটি ছেলে সন্তান। খরচের হার বেড়ে যাওয়ায় টিউশনির ১ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে হ্যান্ড ও ব্লক পেইন্টিং এর কিছু পণ্য দিয়েই শুরু করেন অফলাইন ব্যবসা।
প্রথমে আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের নিকট বিক্রি করা এসব পণ্যে বেশ সাড়া পেয়ে ২০২৩ সালে যুক্ত হন অনলাইনেও। এর মধ্যে তাদের দাম্পত্য জীবনে আসেন আরেকটি ছেলে সন্তান। দুই সন্তানের জননী খাদিজা আক্তার তার হাতের তৈরি বাটিকের কাজ, চুড়ি ডিজাইন, সেলাই এর কাজ, হ্যান্ড ও ব্লক পেইন্টিং, নকশি কাঁথা সেলাই, কুশিকাটা, কেক তৈরি সহ হাতের যাবতীয় কাজগুলো দিয়েই বেশ পরিচিত। এছাড়া তিনি অর্জন করেছেন প্যারামেডিকেল কোর্স, কম্পিউটার শেখা ও আনসার ভিডিপি ট্রেনিং।
একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করা স্বামীর আয়ে যেন কুলিয়ে উঠতে পারছেন না খাদিজা আক্তার। বাবার পরিবারের সাপোর্ট সহ ছোট বোনের লেখাপড়ার খরচও বহন করতে হয় তাকে। তার উদ্যোক্তা লাইফে প্রথম দিকে কারো তেমন কোন সহযোগিতা না পেলেও পরবর্তীতে স্বামীর উৎসাহ নিয়েই এ পর্যন্ত এসেছেন তিনি। নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া মেয়েটি অর্থাভাবে লেখাপড়া চালাতে কস্ট হওয়ায় সপ্তম শ্রেণী থেকেই টিউশনি শুরু করেন। তখন থেকেই তিনি তার নিজের ইনকাম দিয়ে চলতে থাকেন।
নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে খাদিজা টিউশনির এক হাজার টাকার পুঁজি এখন প্রায় ২ লক্ষ টাকার মতো। এদিকে নিজে সফল হওয়ার পাশাপাশি স্বপ্ন দেখেন উদ্যোক্তা তৈরির, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা তৈরির। এতেও সফল তিনি। বলা যায় নারী উদ্যোক্তা তৈরির ‘উদ্যোক্তা’ খাদিজা আক্তার। তিনি কুমিল্লা শহরের ছোট বড় বিভিন্ন নারীদেরকে হাতের কাজ শেখাতে বড় ভূমিকা রাখছেন। এতে তিনি বেশ আনন্দ উপভোগ করছেন। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে Khadija fashion house নামে পেইজে তার ব্যবসাও অনেকটা সফলতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে।
এতকিছুর মাঝেও গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করা খাদিজা আক্তার বলেন, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান। আমার শৈশবকাল ছিল খুবই কষ্টের। টাকার অভাবে বহুদিন বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ হেটে কলেজে গিয়েছি। সেখান থেকেই জীবনের শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি একদিন নিজের যোগ্যতায় বড় হবো। নিজের পরিচয়ে বাঁচবো। সেই থেকে নেমে পড়ি এক জীবন যুদ্ধে। “নিজের বলার মতো একটি গল্প” ফাউন্ডেশন ও “হাজীগঞ্জ ই-কমার্স” এর মেম্বার হয়ে কাজের দৃঢ়তা বাড়াই। শত কষ্টের পর আজ আলহামদুলিল্লাহ সফলতা পেলাম। ইসলাম প্রিয় খাদিজা শালীনতা বজায় রেখে তার শখের ব্যবসায় কম লাভে পণ্য বিক্রি করেন বলে জানান তিনি।
স্বামী সংসার সামলে এই নারী উদ্যোক্তা জানান, আমার উদ্যোক্তা লাইফের প্রথমদিকে মানসম্পন্ন পণ্য ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা ছিল। পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধিও। তবে একসময়  পোশাক ও কসমেটিক সামগ্রী নিয়ে একটা শোরুম দেয়ার খবুই ইচ্ছে। পাশাপাশি সমাজের অসহায় নারীদেরকে ব্লক পেইন্টিং ও সেলাইয়ের শিখিয়ে তাদেরকে স্বাবলম্বী বানাতে চাই। যাতে আমার মতো পরিস্থিতিতে তাদেরকে পড়তে না হয়। আর সৎ ইনকাম দিয়ে হজ্ব করারও ইচ্ছে রয়েছে আমার।
সমাজকর্মী ও ফিচার লেখক
চাঁদপুর সদর।

উৎপাদনই বদলাবে বাংলাদেশ: দক্ষতা বৃদ্ধিতে চাঁদপুরে ব্যবসায়ী সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
উৎপাদনই বদলাবে বাংলাদেশ: দক্ষতা বৃদ্ধিতে চাঁদপুরে ব্যবসায়ী সম্মেলন

চাঁদপুরে ‘টাকা মাত্র ১০ হাজার, খুলবে ব্যবসার দ্বার’ এই স্লোগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যবসায়ী সম্মেলন। সম্মেলনে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তরান্বিত করতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, সৎ-আদর্শ ব্যবসায়ী গড়ে তোলা এবং উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন বক্তারা।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে চাঁদপুর শহরের চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ইউরেশিয়া কনভেনশন হলে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টস অ্যান্ড বিজনেসমেন ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন (আইবিডাব্লিউএফ) চাঁদপুর জেলা শাখা এ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘২০৫০ সালের বিশ্ব শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের উৎপাদনে যেতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় দেশ। ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজার থাকায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যবসায়ীদের উৎপাদনমুখী হতে হবে।’

Model Hospital

চীনসহ বিভিন্ন উৎপাদনকারী দেশ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উৎপাদনই এসব দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শক্তি।

তিনি আরও বলেন, সম্পদ অর্জন করতে হবে, তবে তা অবশ্যই সৎ পথে। সংগঠনের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা ধর্মীয় পরিচয়ে কোনো বাধা নেই, তবে সততা থাকতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা, সততা, সাহস, দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চাঁদপুরেও বড় শিল্পোদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব।’

সম্মেলনে অংশ নেওয়া পাঁচ শতাধিক ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র ১৬ জন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই উদ্যোক্তারা চাঁদপুরে শিল্পায়নের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছেন। মাত্র তিনটি মেশিন দিয়ে উৎপাদন শুরু করে তিন বছরের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্ধশতাধিক মেশিনে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করতে দেখেছেন বলেও নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের সাফল্য নতুন উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।

আইবিডাব্লিউএফের চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক শাহ্ আলমের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক হুমায়ুন কবির পাটওয়ারী, কুমিল্লা আঞ্চলিক সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম খাদেম এবং জেলা শাখার উপদেষ্টা অধ্যক্ষ মো. হারুন অর রশিদ উসমানী।

জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সহসভাপতি মোজাম্মেল হক পরান ও বাদশা ফয়সাল।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে বক্তব্য দেন মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিক, শাখাওয়াত হোসেন, আবুবকর সিদ্দিক, হাফেজ তাজবীর ও সাইফুল ইসলাম সবুজ প্রমুখ।

বক্তারা নিজেদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলেন। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং সততা ও আদর্শের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানান।