মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

যে মসজিদকে ঘিরে হাজীগঞ্জের ঐতিহ্য, সেই মসজিদ ও বাজারের গল্পে ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৪ এম
যে মসজিদকে ঘিরে হাজীগঞ্জের ঐতিহ্য, সেই মসজিদ ও বাজারের গল্পে ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী

ঐতিহাসিক বড় মসজিদ, বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক স্থাপনা ও হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান—হাজীগঞ্জের উন্নয়নগাথায় কতটা জড়িয়ে আছে ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারীর অবদান? আবার মসজিদ কমপ্লেক্সের সম্পদ, ব্যবস্থাপনা ও চলমান মামলাগুলো নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ—শুধু ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি ধর্মীয় অনুভূতি, আস্থা, ঐতিহ্য ও অসংখ্য মানুষের স্মৃতির এক অনন্য ঠিকানা। প্রতি শুক্রবার দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মুসল্লির সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে মসজিদ প্রাঙ্গণ। কেউ আসেন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমতের আশায়, কেউবা এই ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মসজিদ হাজীগঞ্জের পরিচয় বহন করে চলেছে।

কিন্তু এই মসজিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা হাজীগঞ্জ বাজারের বাণিজ্যিক বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতির পরিবর্তনের গল্পটিও কি আমরা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করি?

এই প্রশ্নের সঙ্গে অবধারিতভাবেই সামনে আসে একটি নাম—ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী।

ঐতিহাসিক বড় মসজিদ: ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে জনমানুষের আস্থার ঠিকানা

Model Hospital

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত মনিরুদ্দিন মনাই হাজী (রহ.)-এর দৌহিত্র আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) প্রথমে নিজের মালিকানাধীন বাগানবাড়িতে ছোট পরিসরে মসজিদ নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে স্বপ্ন ও পরিকল্পনাকে সামনে রেখে বড় পরিসরে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। মসজিদ নির্মাণের জন্য নিজ উদ্যোগে ইটভাটা স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

১৩৩৭ বঙ্গাব্দে হযরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.)-এর মাধ্যমে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয় বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। মসজিদের দেয়ালে পবিত্র কোরআনের সূরা ইয়াসিন ও সূরা জুমার সংযোজনও এর ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

আজ এই মসজিদ শুধু হাজীগঞ্জের নয়, চাঁদপুর জেলার অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় নিদর্শন। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের পদচারণা এবং শুক্রবারের বিশাল জামাত এই মসজিদের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

হাজীগঞ্জের বাণিজ্যিক বিকাশে ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারীর ভূমিকা

ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারীকে নিয়ে মানুষের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে। তাঁর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি হাজীগঞ্জের সামাজিক ও বাণিজ্যিক পরিসর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তাঁর সঙ্গে হাজীগঞ্জ প্রেসক্লাব, হাজীগঞ্জ রোটারি ক্লাব, হাজীগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী সমিতি ও বনফুল সংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোগের সংশ্লিষ্টতার কথা স্থানীয়ভাবে আলোচিত। পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেন অনেকে।

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্সকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রজনীগন্ধা মার্কেট, কওমি মাদ্রাসা মার্কেট, হাজীগঞ্জ টাওয়ার, হাজীগঞ্জ প্লাজা ও মকিমউদ্দিন শপিং সেন্টারের মতো বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা পরিচালনা করছেন বহু উদ্যোক্তা; কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন অসংখ্য মানুষ।

একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা মানে শুধু কয়েকটি দোকান বা ভবন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যবসায়ী, কর্মচারী, পরিবহনশ্রমিক, সরবরাহকারী এবং তাঁদের পরিবারের জীবিকা।

সেই বিবেচনায় হাজীগঞ্জের বাণিজ্যিক বিকাশে যাঁরা পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের অবদান যেমন মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, তেমনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।

হাজীগঞ্জ বাজারের পরিচয়: ঐতিহ্য, ধর্ম ও বাণিজ্যের সম্মিলন

প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, হযরত মনিরুদ্দিন মনাই হাজী (রহ.)-এর নামের সঙ্গে হাজীগঞ্জের নামকরণের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাঁর উদ্যোগে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং হাজীর হাট থেকে হাজীর বাজার হয়ে বর্তমান হাজীগঞ্জের পরিচিতি গড়ে ওঠার কথা স্থানীয়ভাবে বলা হয়ে থাকে।

সময় বদলেছে, বদলেছে বাজারের পরিসরও। আজ হাজীগঞ্জ শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এই বিকাশে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের অবদান রয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক বড় মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোও বাজারের বর্তমান চেহারা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে।

তাই হাজীগঞ্জের উন্নয়নকে কোনো একজন ব্যক্তির একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখার চেয়ে বিভিন্ন সময়ের উদ্যোগ, বিনিয়োগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার আলোকে মূল্যায়ন করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

উন্নয়নের আড়ালে ক্ষতিগ্রস্তদের কথাও ভুলে গেলে চলবে না

বড় কোনো স্থাপনা কিংবা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে ওঠার পেছনে যেমন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকে, তেমনি জমি, সম্পত্তি বা অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও থাকতে পারে।

উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বক্তব্য উপেক্ষা করা নয়। বরং যাঁরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা, প্রয়োজন হলে প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন বিরোধ এড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

হাজীগঞ্জের বাণিজ্যিক বিকাশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মসজিদের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন কেন?

ঐতিহাসিক বড় মসজিদকে কেন্দ্র করে এত বড় বাণিজ্যিক পরিসর গড়ে উঠেছে—এ বাস্তবতায় মসজিদের নিজস্ব অবকাঠামো, মুসল্লিদের সুযোগ-সুবিধা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা থাকাটাই স্বাভাবিক।

মসজিদের সংস্কার, সম্প্রসারণ, মুসল্লিদের আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো তাই গুরুত্বপূর্ণ।

মসজিদ কমপ্লেক্সের সম্পদ শুধু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিষয় নয়; এটি একটি ধর্মীয় আমানত। এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক হিসাব সংরক্ষণ এবং নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে মুসল্লি ও সাধারণ মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।

যদি মসজিদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, চলমান কাজ, ভবিষ্যৎ প্রকল্প ও ব্যয়ের হিসাব নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়, তাহলে অনেক প্রশ্নের উত্তর স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যাবে। সমালোচনার জবাব হওয়া উচিত তথ্য, স্বচ্ছতা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে।

মামলা ও আটক হওয়ার ঘটনা: অভিযোগের বিচার হোক আইনের পথে

ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারী ও বর্তমান মোতাওয়াল্লী প্রিন্স শাকিল আহমেদকে ঘিরে মামলা ও আদালত-সংশ্লিষ্ট আটক হওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

তবে এ ধরনের ঘটনায় আবেগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়। অভিযোগ, মামলার নথি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং আদালতের আদেশের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা মূল্যায়ন করা উচিত।

একইভাবে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বড় পরিসরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম রয়েছে বলেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিত্তিহীন হয়ে যায় না। আবার মামলা হয়েছে বলেই অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার, হিসাব কর্মকর্তা কিংবা অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্মী থাকলে আর্থিক লেনদেনের দায়িত্ব কার, কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ গ্রহণ ও পরিশোধ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে কী রয়েছে—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সত্য উদ্‌ঘাটিত হোক, নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক—এটাই হওয়া উচিত সবার প্রত্যাশা।

অসাধুতা থাকলে ব্যবস্থা, ভালো উদ্যোগ থাকলে স্বীকৃতি

কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পেছনে অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব কিংবা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তাকে অসৎ আখ্যা দেওয়াও উচিত নয়।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সম্পদের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা গেলে মসজিদ কমপ্লেক্সের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।

একই সঙ্গে যাঁরা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ডে বাস্তব অবদান রেখেছেন, তাঁদের কাজের যথাযথ মূল্যায়নও প্রয়োজন।

কারও ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া মানে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ উপেক্ষা করা নয়। আবার অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার চাওয়া মানে তাঁর সব অবদান অস্বীকার করাও নয়।

শেষ কথা: ঐতিহ্য রক্ষা হোক, সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ আমাদের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এই মসজিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছে। এই দুই বাস্তবতাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

ড. আলমগীর কবির পাটওয়ারীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তাঁর কাজের সমালোচনাও হতে পারে। তবে সেই আলোচনা হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে। একইভাবে মসজিদ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তরও দিতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে।

আমাদের প্রত্যাশা—ঐতিহাসিক বড় মসজিদের পবিত্রতা অক্ষুণ্ন থাকুক, মসজিদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকুক, মুসল্লিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ুক, বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হোক এবং সংশ্লিষ্ট সব বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি হোক।

কারও অবদানকে অস্বীকার নয়, কারও অন্যায়কে প্রশ্রয় নয়—হাজীগঞ্জের ঐতিহ্য, মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে থাকাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

সম্পাদনায় : সাইফুল ইসলাম সিফাত

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা চাঁদপুরের ডিসি, সেরা তিন ইউএনও

মাঈনুল ইসলাম প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৬ এম
জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে দেশসেরা চাঁদপুরের ডিসি, সেরা তিন ইউএনও

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে জাতীয় পর্যায়ে সেরা জেলা প্রশাসক নির্বাচিত হয়েছেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আহমেদ জিয়াউর রহমান। একই কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বীকৃতিও পেয়েছেন চাঁদপুরের তিন কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা, দ্বিতীয় হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং তৃতীয় শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুন।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমের মূল্যায়নে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, নিবন্ধনের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ এ সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় চাঁদপুরের এ অর্জন জেলার প্রশাসনিক অঙ্গনে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সেবার মান উন্নয়নে পরিকল্পিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়ের গুরুত্ব এ সাফল্যের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ, বিশেষ উদ্যোগে সাফল্য

Model Hospital

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে অগ্রগতি আনতে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করেছেন বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও শাহরাস্তি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা।

তাঁরা জানান, গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মাঠপর্যায়ে পাঠিয়ে জন্ম ও মৃত্যু-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে যুক্ত কর্মী, টিকাদান কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়েছে। যেসব শিশুর জন্ম নিবন্ধন তখনো হয়নি, তাদের শনাক্ত করে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, কোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধন যেন বাদ না পড়ে, সে জন্য বাড়ি বাড়ি যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জন্মের পর প্রথম ছয় মাসের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিবন্ধন কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তাঁদের ভাষ্য, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।

প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির ওপর জোর

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, আগের মাসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে চাঁদপুর কিছুটা পিছিয়ে ছিল। পরে কার্যক্রমের গতি বাড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও গ্রাম পুলিশের সদস্যদের নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি বলেন, আগে যেসব জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন আটকে ছিল কিংবা বিভিন্ন কারণে নিবন্ধন সম্পন্ন হয়নি, সেগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রাম পুলিশ ও টিকাদান কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কেউ যেন নিবন্ধনের বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিনের কাজের বিবরণ নেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। সর্বোচ্চ তথ্যনির্ভর ও সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা থেকেই এ সাফল্য এসেছে বলে তিনি মনে করেন।

অভিনন্দন জানিয়েছে চাঁদপুর প্রেস ক্লাব

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রমে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও তিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এ অর্জনে অভিনন্দন জানিয়েছেন চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী ও সাধারণ সম্পাদক এম এ লতিফ।

এক অভিনন্দন বার্তায় তাঁরা বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় এ অর্জন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা, জনবান্ধব উদ্যোগ এবং সেবামুখী কার্যক্রম চাঁদপুরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জেলার নাগরিক সেবার মান আরও উন্নত হবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত, সহজ ও হয়রানিমুক্তভাবে সরকারি সেবা পাবেন।

সেবায় সন্তুষ্টির কথা জানালেন স্থানীয়রা

চাঁদপুরের কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা নিয়মিত নাগরিক সেবা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। কোনো সমস্যা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও সমাধান পাওয়ার কথা বলেছেন কেউ কেউ।

তবে সেবার এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলেও মনে করেন তাঁরা।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে চাঁদপুরের এ অর্জনকে নাগরিক সেবার উন্নয়নে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, সমন্বিত উদ্যোগ ও নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও জেলার অন্যান্য সরকারি সেবায় এমন সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।