বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

কচুয়ায় ভ্রাম্যমাণ বেদে জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপন

ইসমাইল হোসেন বিপ্লব, কচুয়া প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:১৭ পিএম
কচুয়ায় ভ্রাম্যমাণ বেদে জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপন

কচুয়ায় একটি ভ্রাম্যমাণ বেদে জনগোষ্ঠী পলিথিনের ছাউনী টেনে মানবেতর জীবন যাপন।

চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ-কচুয়ার সড়কের কড়ইয়া ব্রিজের পূর্ব পাশে একটি খোলা মাঠে অস্থায়ীভাবে বসতি ঘরে বসবাস করছে বেদের একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। তাদের নির্দিষ্ট ঘর বাড়ি না থাকায়,এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দেখা যায় এদের। এরা বেঁচে থাকার জন্য বিচিত্র সব পেশা। নর-নারী, শিশুর অদ্ভুত তাদের চেহারা ও কথাবার্তা।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাজীগঞ্জ কচুয়া সড়কের কড়ইয়া ব্রিজের পূর্ব পাশে একটি খোলা মাঠে বাঁশ ও পলিথিনে তৈরি ছাউনী বানিয়ে গত এক মাস ধরে বসবাস করে আসছে বেদের একটি ভ্রাম্যমাণ জনগোষ্ঠী। এখানে ১৬টি বেদে পরিবার আছে।

এই ১৬ পরিবারে ৫৫ জন সদস্য আছে। এদের কারো বাড়িঘর ও নিজস্ব জায়গা সম্পত্তি নেই,এদের মূল ঠিকানা বিক্রমপুর এলাকা। টানা দিন যাবত কালবৈশাখী ঝড় বৃষ্টি ও বাড়ি বর্ষণে পানির নিচে থাকতে হচ্ছে তাদের। নেই কোন আয়-রোজগার, অনেকেই অনাহার আর মানবেতর জীবনযাপন।

বর্তমানে তারা সাহায্য সহযোগিতার জন্য তাকিয়ে রয়েছে, কেউ তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য আসেনি।

Model Hospital

বেদে নারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের মানুষ বর্তমানে সাপ খেলা দেখতে চায় না। কেউ নেয় না ওদের চিকিৎসাও। কাউকে সাপে কাটলে এখন আর ডাক পড়ে না বেদেদের। আগের মতো ব্যবসা এখন আর হয় না। প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে বেদে সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

তারা আরো জানায়,এক সময় শুধুই নারীরা সাপ খেলা দেখিয়ে বা কবিরাজি করে অর্থ উপার্জন করতো। কিন্তু বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়েই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরেও আগের মতো উপার্জন করতে পারে না। এছাড়াও আগের মত এখন আর সাপ পাওয়া যায় না। আমাদের চিকিৎসাও গ্রাম্য লোকজন আগের মত নেয় না।

আলী হোসাইন বলেন, কালবৈশাখী ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতে বের হতে পারছি না। সন্তানদেরকে নিয়ে পানির নিচে থাকতে হচ্ছে। জমিনের উপর কোন শুকনা জায়গায়ও নেই, যেখানে সন্তানকে একটু সুরক্ষা রাখতে পারবো। সন্তানদেরকে কাঁধে নিয়ে পানির উপর বসে থাকতে হচ্ছে। আজ ৩ দিন ধরে আমাদের সাথে সবাই গ্রামগঞ্জে বের হতে পারছি না। আমাদের কোন ব্যবসা-বাণিজ নেই এখন।

একদিকে নেই কোন উপার্জন, অন্যদিকে রান্নাবান্না করতে পারছি না। সন্তানদেরকে কি খাওয়াবো, কেউ আমাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করতে আসেনি। খাবারের ক্ষুধার্ত জ্বালায় মাটির নিচে তাকি ও সন্তানদের কান্না শুনতে হচ্ছে ।

অস্থায়ীভাবে বসবাস করা বেদে সম্প্রদায়ের বাসিন্দা মর্জিনা বেগম বলেন, খোলা আকাশের নিচে এভাবেই চলছে আমাদের জীবন-জীবিকা। সিংগা লাগাই, পোকা উটাই ও মাচা কমর টানি। এভাবেই চলতে হয়, খুব কষ্ট আমাদের। বাড়ি নাই ঘর নাই এভাবেই পলিথিন দিয়ে তাঁবু খাটিয়ে থাকি। ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা করাতে পারিনি অনেক কষ্ট আছি ভাই।

কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী নোমান হোসেন বলেন, ‘দরিদ্রতার চরম সীমায় আছে এ বেদে সম্প্রদায়। মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন; শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক, চিত্তবিনোদন – কিছুই নেই। তাদের ভবিষ্যৎ কী তা-ও অজানা। আমরা চাই তাদের স্থায়ী একটা ঠিকানা হোক।

৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর চিকিৎসায় চিকিৎসক-নার্স ও SACMOদের সমন্বিত উদ্যোগ

শাহরাস্তিতে প্রথম জরুরি বিভাগেই সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম

মোঃ মাসুদ রানা প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৬ এম
শাহরাস্তিতে প্রথম জরুরি বিভাগেই সাপে-কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম
শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথমবারের মতো জরুরি বিভাগেই সাপের কামড়ে আক্রান্ত এক রোগীকে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (ASV) দেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাতে সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণীর শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। চিকিৎসক, নার্স ও SACMOদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় জরুরি বিভাগেই শুরু হয় চিকিৎসা। পরে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রোগী আসমা আক্তার (২৩) উপজেলার মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী আল-আমীন।
বুধবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে নিজ বাড়িতে সাপের কামড়ের শিকার হন আসমা। স্বজনরা দ্রুত তাঁকে রাত ৯টার দিকে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। ওই সময় তিনি প্রায় আট সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নুরুন নবী জুয়েল তাঁকে পরীক্ষা করেন।
এ সময় কামড়ের স্থান ফোলা ও কালচে হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রোগীর শরীরে সাপের বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায়। তাঁর চোখের পাতা ঝুলে পড়া (Ptosis) এবং ‘Broken Neck Sign’-এর মতো লক্ষণও প্রকাশ পায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসক দ্রুত অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে জরুরি বিভাগেই অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়া শুরু হয়। চিকিৎসা পর্যায়ে রোগীকে মোট ১০ ভায়াল অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়।
চিকিৎসা চলাকালে রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন চিকিৎসক, নার্স ও SACMOরা। চিকিৎসার পর তাঁর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে পরবর্তী ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UHFPO) ডা. মো. আবু নাছের শাকিল বলেন, “জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপে-কাটা কোনো রোগীকে জরুরি বিভাগেই অ্যান্টিভেনম দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। বিশেষ করে রোগীটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। দ্রুত হাসপাতালে আনা এবং বিষক্রিয়ার লক্ষণ শনাক্ত হওয়ার পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হওয়ায় জরুরি ব্যবস্থাপনা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, সাপের কামড়ের পর সময় নষ্ট না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। স্থানীয়ভাবে ঝাড়ফুঁক বা অন্য কোনো প্রচলিত পদ্ধতিতে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
উল্লেখ্য, সময়ের সঙ্গে শাহরাস্তি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবার পরিধিও বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  বেগম খালেদা জিয়ার সময় হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শাহরাস্তিতে আগমন উপলক্ষে সম্প্রতি  হাসপাতালটি ৫১ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় এবং পরে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ জন স্থানীয় সাংসদ লায়ন ইন্জিঃ মমিনুল হক এমপি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনিরা খাতুনকে  সবাই ধন্যবাদ জানান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মনে করছে, জরুরি বিভাগে সাপে-কাটা রোগীর অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের এই ঘটনা স্থানীয় মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ও বার্তা ।
একজন অন্তঃসত্ত্বা তরুণীর সংকটময় সময়ে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মিলিত উদ্যোগে দ্রুত চিকিৎসা শুরু হওয়ার ঘটনাটি সেই সক্ষমতারই একটি মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।