শাহরাস্তি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ওয়ারুক রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পুনঃসজ্জিত আধুনিক পাঠাগারের উদ্বোধন করা হয়েছে।
রবিবার (৪ অক্টোবর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ, পাঠাগার উদ্বোধন এবং কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ২০২৬ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ফিতা কেটে পাঠাগারটির উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লায়ন প্রকৌশলী মমিনুল হক এমপি। ওই বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আবু ইউসুফ রুপনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন।
এর পর প্রধান অতিথির বক্তব্যে মমিনুল হক এমপি বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য স্মরণ করে বলেন, ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবির প্রতিফলন। প্রতিষ্ঠানের বিকাশে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানদের ভালোভাবে গড়ে তুলতে হলে মেয়ে ও ছেলে উভয়কেই সমান যত্নে রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন বলেই আজ ছেলেমেয়েরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
শিক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। আগামীতে তা আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর আশা রয়েছে।
তিনি জানান, বিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে সাতশ জনকে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলে কারিগরি শিক্ষা ও ইন্টারমিডিয়েট কলেজ সরকারিকরণের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ, কম সময়ের মধ্যেই আমরা এসব প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের উদ্যোগ নেব।
তিনি শিক্ষকদের পাঠদানে আরও যত্নবান হয়ে ফলাফল উন্নত করার অনুরোধ জানান এবং শিক্ষার্থীদের বলেন, বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভালো ফল করে এর সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনিরা খাতুন পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগের জন্য পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবু ইউসুফ রুপনকে ব্যক্তিগত ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম যেন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারে, সে সুযোগ তিনি করে দিয়েছেন। ইউএনও জানান, উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিগগিরই বই পড়া কর্মসূচি শুরু হবে। এতে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে পাঁচটি বই পড়বে এবং দৈবচয়নের ভিত্তিতে একটি বইয়ের মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে। সেরা “বইপোকা” নির্বাচিত শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকার পুরস্কার দেওয়া হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠাগারের সুযোগ সবার আগে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১২৭ বছরের পুরোনো এই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। বর্তমানে শিক্ষার্থী ১ হাজার ৪১৩ জন। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক আবু ইউসুফ রুপন পাটওয়ারী পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ উদ্যোগে উন্নয়নকাজ করছেন। অল্প কয়েক মাসের মধ্যে মাঠ ভরাট, অফিস অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক পাঠাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
একটি কক্ষে গড়া এই পাঠাগারে একসঙ্গে ২৫ জন শিক্ষার্থী বসে পড়তে পারবে। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার বই রয়েছে; সংগ্রহে থাকা আরও আড়াই হাজার বই যুক্ত হলে মোট বই হবে চার হাজার। সংগ্রহে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সুকুমার সেন, মাহফুজা খানম ও মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল রহীমসহ বিভিন্ন লেখকের বই।
প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন জানান, সভাপতির নিজ উদ্যোগে ও নিজস্ব অর্থায়নে পাঠাগারটি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আবু ইউসুফ রুপন বলেন, “এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আমি বড় হয়েছি। এখান থেকে শিক্ষা নিয়েছি, এবার দেওয়ার পালা। সকলের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করব।
বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন শাহরাস্তি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব আয়েত আলী ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক তাঁতীদলের সভাপতি ও গণমাধ্যমকর্মী জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইকবাল হোসেন, হাজীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আলী আজগর মিয়াজী, ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ কামরুজ্জামান, মাধ্যমিক সমাজ কল্যাণ শিক্ষক সমিতির সভাপতি আঃ আব্দুর রহিম এবং ছাত্রদল সভাপতি ইঞ্জি. এবিএম পলাশ।
উদ্বোধনের পর অনুষ্ঠিত সভা শেষে অতিথিরা বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বিজয়ী এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।