শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

সংসারের শেকল ভেঙে ক্যামেরার সামনে চাঁদপুরের অদম্য এক নারী সাংবাদিক সাবিত্রী রানী ঘোষ

সাইদ হোসেন অপু চৌধুরী প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, ৮:৪৮ পিএম
সংসারের শেকল ভেঙে ক্যামেরার সামনে চাঁদপুরের অদম্য এক নারী সাংবাদিক সাবিত্রী রানী ঘোষ

চাঁদপুর জেলায় সাংবাদিকতার অঙ্গনে যেখানে পুরুষদের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে, সেখানে সাহস, নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা নিয়ে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন সাবিত্রী রানী ঘোষ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চাঁদপুরের একমাত্র নারী সাংবাদিক হিসেবে সত্যের অনুসন্ধান এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার কাজে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

শৈশব থেকেই সমাজের নানা অসঙ্গতি তাকে ভাবিয়ে তুলত। মানুষের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছা থেকেই তার সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। সেই আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে তিনি স্থানীয় সংবাদ সংগ্রহ, প্রতিবেদন লেখা এবং বিভিন্ন সামাজিক বিষয় তুলে ধরার মাধ্যমে সাংবাদিকতায় নিজের দক্ষতা ও পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।

বর্তমানে তিনি পাক্ষিক “চাঁদনগর” পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি প্রীতি মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা এবং সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরতে তিনি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। তিনি গোপাল জিউর আখড়া মন্দিরের মহিলা সম্পাদিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং পুরানবাজার ঘোষপাড়া গীতা মন্দিরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত আছেন। এছাড়াও তিনি অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর নির্বাহী সদস্য এবং বিনিময় নাট্যগোষ্ঠীর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

Model Hospital

চাঁদপুরের একমাত্র নারী সাংবাদিক হিসেবে মফস্বল সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি মর্যাদাপূর্ণ “ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অ্যাওয়ার্ড” লাভ করেন। এ অ্যাওয়ার্ড অর্জনের পর চাঁদপুরের মাঠ পর্যায়ে সাংবাদিকদের সংগঠন ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন তার হাতে সম্মাননা প্রদান করে। পাশাপাশি, তার বহুমুখী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, চাঁদপুর জেলা সাংবাদিক ক্লাব, চাঁদপুর সাহিত্য মঞ্চ, চাঁদপুর ল্যাবরেটরি স্কুল, মেঘনাবার্তা, চাঁদপুর সংবাদ, বিনিময়, অনন্যা, বিশ্ব বাঙালিসহ বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম সংগঠন তাকে সম্মাননা প্রদান করেছে।

একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে পথচলা সহজ ছিল না। মাঠ পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ, দূর-দূরান্তে গিয়ে তথ্য অনুসন্ধান এবং নানা সামাজিক বাধা—সবকিছুই তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। তবুও তিনি সাহস ও দায়িত্ববোধকে শক্তি হিসেবে নিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাংবাদিকতা নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সাবিত্রী রানী ঘোষ বলেন,
“সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু পেশা নয়, এটি একটি দায়িত্ব। সমাজের সত্য তুলে ধরা এবং মানুষের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার লক্ষ্য। চাঁদপুরে একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে পথটা সহজ ছিল না, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতাই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমি চাই ভবিষ্যতে আরও অনেক নারী সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসুক। নারী সমাজ যদি সাহস নিয়ে সামনে আসে, তাহলে সমাজ আরও সমৃদ্ধ হবে।”

দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকে সাবিত্রী রানী ঘোষ আজ চাঁদপুরের নারী সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। সচেতন মহলের মতে, তার সাহসী ও নিষ্ঠাবান কর্মপ্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও চাঁদপুরের সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’