শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

যাকাত হোক সুন্দর এবং সুন্দরতম

হাসিসা সুরমা প্রকাশিত: শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪, ৮:৩৮ পিএম
যাকাত হোক সুন্দর এবং সুন্দরতম
মহান আল্লাহ পাক তার ইবাদতের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর আনুগত্য,আদেশ মেনে চলা এবং নিষেধ থেকে দুরে থাকার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ প্রিয় থেকে আরো প্রিয় হয়ে উঠে। মহান রব ইরশাদ করেছেন,”আমি তার প্রাণশিরা অপেক্ষা অধিক নিকটে আছি” (সুরা কাফ:১৬)।
আর ইবাদত শারিরীক এবং আর্থিক দু’ধরনের হয়ে থাকে। যাকাত হল আর্থিক ইবাদত, যা সঠিকভাবে পালনের মাধ্যমে বান্দা মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। যাকাত গরীব দুঃখীদের হক বা পাওনা। যা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে গরীবদের প্রতি ধনীদের জন্য অর্পিত দায়িত্ব। মুসলিম জাতির জন্য এক বিশাল নেয়ামত, যা গরিবের অভাব মোচন এবং ধনীদের সম্পদ বাড়িয়ে দিতে এক বিশাল ভুমিকা পালন করে।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে বিশ্বাসীরা! তোমাদের আমি যা দিয়েছি তা থেকে দান করো সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো রকম বেচাকেনা, বন্ধুত্ব এবং সুপারিশ থাকবে না“ (সুরা বাকারা: ২৫৪)।
যাকাত কখন কিভাবে ফরজ হয় এসব বিষয়ে সকলে অবগত হলেও যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু অবহেলা বা অসাবধানতার কারনে এই বিশাল নেয়ামত থেকে পিছিয়ে পড়ছে মুসলিম সমাজ। দেখা যায়,যাকাত দেয়া হয় লোক দেখানো, সোস্যাল মিডিয়ায় নিজের প্রচার প্রচারণা, যশ খ্যাতি ইত্যাদি লাভের আশায়, যা খুবই নিন্দনীয় এবং গর্হিত কাজ। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে বিশ্বাসীরা! তোমরা দানের কথা প্রচার করে এবং (দান গ্রহণকারীকে) কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করে দিয়ো না, ঠিক ঐ লোকের মতো যে শুধু লোক দেখানোর উদ্দেশ্যেই দান করে।“ (সুরা বাকারা: ২৬৪)
যাকাত মুসলিম জাতির জন্য মহান রবের নির্দেশ। যাকাত দিতে হবে এমন পন্য যা(কাপড় হওয়া শর্ত নয়) আপনি নিজের জন্য পছন্দ করবেন। যাকাত দিতে কার্পন্য একজন  মুসলিম মুমিনের জন্য কোনভাবে সমীচিন নয়। যাকাত আদায়কারীর এমন মনে করা উচিত নয় যে আমার অর্জিত সম্পদ থেকে তাকে দান করছি। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা যা কিছু দান করো তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করো, আর যা কিছু তোমরা দান করো, তার পুরস্কার পুরোপুরি প্রদান করা হবে।’ -(সুরা বাকারা : ২৭২)
যাকাত হচ্ছে একজন গ্রহীতার অধিকার বা পাওনা। যা কখনোই দাতার অংশ হতে পারে না। সুতরাং যাকাত দিতে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, আপনি যা দিচ্ছেন তা যেন গ্রহীতার কাজে আসে অথবা এমন কিছু দেয়া উচিত যা তার খুব প্রয়োজন। যাকাত মানেই অল্প দামের শাড়ি বা লুংগি নয়। দুঃখের সাথে বলতে হয় মার্কেটে আলাদা করে নিম্নমানের কিছু কাপড় দেখা যায় যেগুলো যাকাতের জন্য নির্ধারিত।  যেই কাপড়গুলো কেউই কিনে না, মানে খারাপ কিন্তু দামে সস্তা। এগুলো একসাথে ১০/২০/৩০ জনের জন্য যাকাত দেয়ার উদ্দেশ্যে কেনা হয়, যা কয়েক  ধোয়াতে আর ব্যবহারের উপযোগী থাকে না।
এক্ষেত্রে গ্রহীতার কোন লাভ না হলেও দাতা তার পরিবার, সমাজ,সোস্যাল মিডিয়ার গর্বের সাথে বলতে পারে ৩০ জনকে যাকাত দিয়েছি। এমন দানের শিক্ষা ইসলাম আমাদের দেয় নি। নবী করীম (সা.) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তিন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন না। তাদের মধ্যে একজন হলো, (দান করে) অনুগ্রহ প্রকাশকারী ব্যক্তি।“-(মুসলিম: ১০৬)
যাকাত দেয়া মানে দাতার দানে গ্রহীতা আনন্দিত হওয়া। যাকাত হতে পারে ১০টি পরিবারকে নির্দিষ্ট কিছু টাকা দেয়া, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাজার করে দেয়া,এক বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। যাকাত একজন মুসলিম ভাই থেকে অন্য ভাইয়ের প্রাপ্য।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় নিজের আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব যারা অভাবী, তাদের বাদ দিয়ে এমন জায়গায় দেয়া হয় যেখানে দিলে নিজের প্রচারণা বাড়বে, মানুষ জানতে পারবে, লোকজন বাহবা দিবে,নামের আগে কয়েকটি উপাধির সংযোজন হবে। এমন লোকের যাকাত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে কখনোই কবুল হবে না। যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে নিজের কাছের মানুষ, আশেপাশের মানুষ অগ্রাধিকার পাবে। সুন্দর হোক মানুষগুলো, সুন্দর থাকুক পৃথিবী।
লেখক:
প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ।
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় , চট্রগ্রাম।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’