শাহরাস্তিতে আলোচিত গৃহবধূ রিগান আক্তার মীম (২৬) হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
শনিবার (১৮ জুলাই) বিকেল ৪টায় শাহরাস্তি পৌরসভার প্রাণকেন্দ্র মেহের কালিবাড়ী মাঠে আয়োজিত এ মানববন্ধনে শত শত নারী-পুরুষ অংশ নেন। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিলও করেন।
অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড। তাদের কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি, মীম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কাউকেই যেন ছাড় দেওয়া না হয় এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। আয়োজক, স্বজন, এলাকাবাসী, বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ, জানায় এ হত্যাকান্ড একটি পরিবারের স্বপ্ন থেমে গেছে। দুই অবুঝ শিশুর মাথা থেকে চিরতরে সরে গেছে মায়ের স্নেহের ছায়া। সেই শোক আর ক্ষোভকে বুকে ধারণ করে শ্রেণি-পেশার শত শত মানুষ।মানববন্ধনে বক্তব্য দেন নিহত মীমের বাবা মোহাম্মদ কবির হোসেন পাটোয়ারী, মা শামসুন্নাহার, চাচাতো ভাই গোলাম কিবরিয়া পাটোয়ারী, রাজনৈতিক নেতা মো. জাকির হোসেন, শিক্ষক শাহাদাত হোসেন ও শিক্ষক জামশেদ আলম পাটোয়ারীসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
আবেগঘন বক্তব্যে মীমের বাবা মোহাম্মদ কবির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, “আমার মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একজন সন্তানের মৃত্যু কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নিহতের মা শামসুন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মেয়ের দুইটি ছোট সন্তান আজ মা-হারা। আমরা শুধু চাই, যেন প্রকৃত বিচার হয় এবং আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়।
চাচাতো ভাই গোলাম কিবরিয়া পাটোয়ারী বলেন, প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে প্রত্যেক দায়ী ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করলেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক নেতা মো. জাকির হোসেন বলেন, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত কারও দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়। শিক্ষক শাহাদাত হোসেন ও শিক্ষক জামশেদ আলম পাটোয়ারীও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানান।
মানববন্ধনে কয়েকজন বক্তা অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনার বাবা-মা এখনও ওই বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার রাতে ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তির পরিচয় ও ভূমিকা উদ্ঘাটন করা হলে ঘটনার আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে তারা দাবি করেন। তবে এসব বক্তব্য বক্তাদের নিজস্ব দাবি ও মতামত বলে উল্লেখ করা হয় এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বলে তারা মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুলাই দিবাগত রাত দেড়টা থেকে তিনটার মধ্যে শাহরাস্তি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বার্ত্তলা মহল্লার বেপারী বাড়িতে রিগান আক্তার মীম নিহত হন। পরদিন ১৫ জুলাই নিহতের বাবা মোহাম্মদ কবির হোসেন শাহরাস্তি মডেল থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা (মামলা নং-২৫) দায়ের করেন।
পরে শাহরাস্তি মডেল থানা পুলিশ ঘটনার মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে নিহতের দেবরের স্ত্রী কাজী সুমাইয়া আক্তার মিনা (২৩)-কে গ্রেপ্তার করে। ১৬ জুলাই তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পুলিশ জানায়, ওই জবানবন্দিতে তিনি পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিহিংসার জেরে শ্বাসরোধ করে মীমকে হত্যার কথা স্বীকার করেন।
শাহরাস্তি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান বলেন,ঘটনার পরপরই পুলিশ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। ঘটনাস্থলের আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। ডাকাতির গল্প সাজিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মানববন্ধন শেষে উপস্থিত জনতা দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। শোকাহত স্বজনদের চোখের জল আর উপস্থিত মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় একটাই প্রত্যাশা, বিচার যেন বিলম্বিত না হয়, সত্য যেন আড়াল না থাকে এবং আর কোনো পরিবার যেন এমন নির্মম পরিণতির শিকার না হয়।