ঢাকা ১০:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সোস্যাল মিডিয়া, ফেক নিউজ ও গণমাধ্যম

ঢাকা: আমার বাবার বয়স প্রায় ৭০ বছর। তিনি একজন অবরসপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আরও অনেকের মতো তার এখন অবসর কাটে মোবাইলে ফেসবুকিং করে। স্বভাবতই তিনি ততটা ‘টেকনোলজি ফ্রেন্ডলি’ নন। ফলে পাসওয়ার্ড ঠিক করে দেওয়া, ছবি আপলোড করে দেওয়া বা কারও প্রোফাইল খুঁজে দেওয়ার মতো করণিক কাজগুলো আমাকেই করতে হয়।

Model Hospital

এই কাজ করতে গিয়ে কিছু জিনিস খেয়াল করি। কিছু বিষয় আমার মাথায় ভিন্ন চিন্তার জন্ম দেয়। যেমন— আমার বাবার সঙ্গে ফেসবুকে যাদের বন্ধুত্ব, তারা প্রায় সবাই কর্মজীবনে তার সহকর্মী ছিলেন। শিক্ষিত মানুষ, সরকারি চাকরি করেছেন, দিন-দুনিয়া দেখেছেন। সেই তারাই এখন যা সব শেয়ার দেন ফেসবুকে, সেগুলোকে আমি চোখ বন্ধ করে ‘ফেক’ বলে চিহ্নিত করতে পারি।

যেহেতু ফেসবুক বন্ধুদের শেয়ার করা বিভিন্ন পোস্ট বা পেজের রিকমেন্ডেশন আমার বাবার টাইমলাইনে চলে আসে, তাই সেগুলো আমার চোখে পড়ে। আমি চেষ্টা করি এসব পেজ বা পোস্ট বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে আনফলো দিয়ে রাখতে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা তো আর সেটা সম্ভব না। ফলে অনেককিছু বাবার নজরে পড়ে যায়। এর কিছু তিনি বিশ্বাস করেন, কোনোটায় সন্দেহ থাকলে আমাকে ফোন করেন। দুই মেয়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত থাকায় অন্তত সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগটুকু তিনি পান।

কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের তো সেই সুযোগটি নেই। তাই ছাপার হরফে, দুয়েকটি ছবি সম্বলিত (হোক না তা এডিট করা) যে খবরই পান, তারা তা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। শুধু তাই না, সেগুলো শেয়ার করে আরও বেশি মানুষকে জানার সুযোগ করে দেন।

এরকম অন্তত ৫০ জনের ফেসবুক টাইমলাইন ঘেঁটে আমি যা দেখতে পেয়েছি, সেগুলোকে সংক্ষেপ করে বললে দাঁড়ায় এমন— কিছু মানুষ আছেন দেশ বা সরকারকে নিয়ে যেকোনো নেতিবাচক খবর বিশ্বাস করেন এবং সেগুলো শেয়ার করেন। এমন না যে তারা সক্রিয়ভাবে সরকারবিরোধী রাজনীতি করেন বা কোনো দলের সদস্য। কিন্তু কোনোভাবে তাদের মাথায় ঢুকে গেছে যে দেশ রসাতলে যাচ্ছে। আর সেটাই বিভিন্ন ‘ভুয়া’ অনলাইন পোর্টালের বা প্রোপাগান্ডা ছড়ায় এমন পোর্টালের খবরের লিংক শেয়ার করে সবাইকে জানান দেন।
বিজ্ঞাপন

আরেক দল আছেন যারা প্রচণ্ডভাবে ধর্মে বিশ্বাসী, সেটা যেকোনো ধর্মেরই হতে পারে। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে তারা নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত খবরের কনটেন্ট শেয়ার দেন। যেমন— গাছের পাতায়, মাংসের টুকরায়, গাছের শেকড়ে, মাছের পেটে, ডিমের খোলসে সৃষ্টিকর্তার নাম অঙ্কিত ছবি, যেটা প্রকৃতপক্ষে এডিট করে বা ‘ফটোশপ’ করে বানানো কি না, সেটিও শেয়ার দেওয়ার সময় ভাবেন না তারা। তারা ধর্মীয় এমন বাণীও শেয়ার করে ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন, যেগুলো আদৌ কোনো ধর্মগ্রন্থে রয়েছে কি না, তা যাচাই করার ধারও ধারেন না। ধর্মের নামে সামান্য খারাপ কিছুও তারা সহ্য করতে পারেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত যেকোনো পোস্ট পড়ে আরেকজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেও তারা দ্বিধা করেন না। তা সে কমেন্ট দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াই হোক, আর পাশের বাড়ির ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে আগুন দিয়েই হোক।

আবার অনেকে দেখা যায়, কয়েক বছর আগে কোথাও পাওয়া কোনো মৃতদেহের বা দাঙ্গার ছবিকে নতুন কোনো ঘটনার সঙ্গে জুড়ে শেয়ার করছেন। আরেকদল মানুষ বুঝে না বুঝে সেটি নানা ধরনের জ্বালাময়ী বা বেদনাবিধুর ভাষা দিয়ে শেয়ার করছেন। অনেক ভুইফোঁড় নিউজ পোর্টালও সেগুলো নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে ছেপে দিচ্ছে।

বিষয়টি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, গুজব ছড়ানো হচ্ছে জানিয়ে আলাদা সংবাদ প্রকাশ করতে হয় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে। দিতে হয় গুজবের পাল্টা জবাবও।

কেন মানুষের ভুয়া, মিথ্যা বা গুজবের খবরের প্রতি এত আগ্রহ?

জানতে কথা বলি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি বললেন, গুজবে বিশ্বাস করা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। কারণ মানুষের মনের একটি অংশই চায় নেতিবাচক খবর বা গুজবে বিশ্বাস করতে।

এই চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষের মনের দুইটি অবস্থা— একটি চেতন মন, অন্যটি অবচেতন। এগুলো আমাদের ইড (Ied) ইগো ও সুপার ইগো দ্বারা পরিচালিত। এই চেতন-অবচেতনের মধ্যে ইড ইগো সবসময় চায় আমাদের কামনা-বাসনাসহ অন্য পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে চরিতার্থ করতে— আমি আমার উদ্দেশ্য হাসিল করব, আমি অনেক কিছু অর্জন করব, আমি টাকা পাব, আমি কাউকে কামনা করব ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে গুজবে মানুষ তার অবদমিত কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার রূপকল্প খুঁজে পায়। যখন এটা গুজব হয়, তার মানে কাউকে আক্রমণ করো, কারও সম্পর্কে খারাপ কিছু বলো, অন্যকে নিচের দিকে কোনোভাবে ঠেলে দাও। এগুলো সামনে পেলে মানুষের মন ইড দ্বারা পরিচালিত হয়। তখন সে সব ধরনের গুজব বিশ্বাস করে। কারণ তার অবচেতন মন সবসময় এ ধরনের বিষয়ই আকাঙ্ক্ষা করে।’

মানুষ সভ্যতার ভেতরে থাকলেও তার মনের ভেতরে কিন্তু জন্মগতভাবেই একটি পাশবিক প্রবৃত্তি থাকে বলে জানান ডা. হেলাল। তিনি বলেন, ইডের প্রভাবে এগুলো ত্বরান্বিত হয়। অবচেতন মনে সে যা চায়, গুজবের মধ্যে সেগুলো পায়। তখন সে গুজবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তা বিশ্বাস করে।

হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এখন আমরা যে লার্নিং প্রসেসের মধ্যে আছি, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা যে লার্নিং প্রসেসের মধ্যে আছে, সেটা শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক বা ইনফরমেশন বেজড। আমরা অনেক বেশি ইনফরমেশন জানি। কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা নলেজ বেজড সোসাইটি কিন্তু আমরা তৈরি করতে পারিনি। তেমন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ যদি থাকত, তবে আমরা সত্য-মিথ্যা যাচাই করে জ্ঞান অর্জন করতে পারতাম। কিন্তু আমরা জ্ঞান অর্জন না করে ইনফরমেশনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছি। ইনফরমেশন অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যদি সেটা মিথ্যা হয়। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে কিন্তু বিপজ্জনক জ্ঞান বলে কিছু নেই। জ্ঞান সবসময় সত্যকেই সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু ইনফরমেশনে সত্যও থাকতে পারে, মিথ্যাও থাকতে পারে।’

এই মনোস্তাত্ত্বিক মনে করেন, মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যেহেতু জ্ঞানভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন করে, তাই তারা সহজে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে না। আজকাল মানুষ সহজ ইনফরমেশন চায়। আর সেটা পায় এসব ভুয়া পোর্টালের কাছে। কারণ তারা সোস্যাল মিডিয়ার ‘উপযোগী’ করে এসব নিউজ তৈরি করে। সেই অনুযায়ী শিরোনাম দেয়, চটক তৈরি করে। সেজন্য তাদের কাছে মানুষ বেশি যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই যে নেতিবাচক খবর বা গুজব ছড়িয়ে পড়া, এ প্রসঙ্গে জানতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরীর কাছে।

ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সে পিএইচডিরত এই শিক্ষক বলেন, গুজব রটানো ঐতিহাসিকভাবে নতুন কিছু না। আগে যখন কোনো যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না, তখন গুজব রটতো বিভিন্ন গ্রামে বা এলাকায়। সাধারণত কোনো জনসমাগম বা জনবহুল এলাকায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ একজন গুজব রটিয়ে দিত। এরপর সেটা মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়ত। এখন এই আধুনিক সমাজে যেহেতু সবারই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www) তথা ইন্টারনেটে প্রবেশ করার সুযোগ আছে, তাই গুজব ছড়ানোটা এখন অনেক সহজ। এখন এক ক্লিকেই গোটা দুনিয়ার কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই যে ব্যাপ্তি, এটা যে কতটা বিশাল, সেটা গুজব রটনাকারী যেমন বুঝতে পারছেন না, তেমনি গুজবে বিশ্বাস স্থাপনকারীও বুঝতে পারছেন না।

সাইফুল আলম বলেন, স্বভাবগতভাবেই মানুষ যেহেতু মুখরোচক বিষয় পছন্দ করে, তাই গুজব রটনাকারীরা সুযোগ পেয়ে যায়। আগে যেমন গ্রামে কেউ গুজব ছড়ালে তাকে খুঁজে বের করে গ্রামপ্রধানরা শাস্তি দিতেন, এখনো সেটার চেষ্টা করে বিভিন্ন দেশ। কিন্তু এই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যুগে বিষয়টি ভীষণ কঠিন। কারণ আমাদের এখানে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, সিনেমা হল নেই, নাটকের মঞ্চ নেই, খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই। মানুষ এই অবস্থায় খোঁজে সুলভ বা সস্তা বিনোদন। সেটা সে পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একজন মানুষ চাইলেই ৫ সেকেন্ড থেকে শুরু করে ৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি অনলাইনে থাকতে পারে। সে যেহেতু সস্তা বিনোদন খোঁজে, তাই কে কাকে বিয়ে করল, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক, কে কয়টা প্রেম করছে— এসব খবরে আগ্রহী হয়। সে গুজব ছড়ায় ও গুজবে বিশ্বাস করে।

কোনো কোনো দেশের সরকার ইন্টারনেটেই এসব বিষয়ের প্রাপ্যতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বসাচ্ছে। আবার উন্নত দেশগুলো এক এক করে খুঁজে বের করছে গুজব রটনাকারীদের। সেভাবেই তাদের শাস্তি দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের অ্যান্টি ফেক নিউজ অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেন গণযোগাযোগের এই শিক্ষক।

এর থেকে উত্তরণের পথ কী— জানতে চাইলে সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, একটা দোকানে ভালো-খারাপ সব ধরনের পণ্যই থাকে। এখন কেউ যদি কমদামে খারাপ জিনিস কেনে, তাহলে সেই পণ্য ব্যবহার করে সে অসুস্থ হতে পারে। তখন চিকিৎসার পেছনে উল্টো বেশি খরচ হবে। অর্থাৎ কমদামে কিনে তিনি যে লাভ করলেন, সেটি আদতে তারই চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, তার মানে একজন মানুষের মধ্যে কী কিনবেন বা কী বিশ্বাস করবেন, তার একটা জ্ঞান থাকতে হবে। এটাকে বলা হচ্ছে মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো স্কুল পর্যায় থেকে এই বিষয়টি কোর্স আকারে পড়াতে শুরু করেছে। এটি কিন্তু সাংবাদিকতা নয়। একজন মানুষ গণমাধ্যমের কোন বিষয়গুলো বিশ্বাস করবেন, কী দেখে মূলধারার গণমাধ্যম বা মিথ্যা খবর চিহ্নিত করবেন, সে বিষয়ক কোর্স।

আমাদের দেশে এই বিষয়টি কোথাও পড়ানো হয় না। ফলে প্রচুর ভুল বানান, ভুল বাক্যগঠন, মূলধারার গণমাধ্যমের নামের আগে পরে ২৪ বা নিউজ ইত্যাদি যোগ করে গজিয়ে ওঠা অনলাইনগুলোর খবরও মানুষ বিশ্বাস করেন, শেয়ার দেন। মিডিয়া লিটারেসি না থাকার কারণেই এসব থেকে অরাজকতা তৈরি হয়, কখনো তা দাঙ্গায় রূপ নেয়। শুধুমাত্র আইন দিয়ে এসব বন্ধ করা সম্ভব না। যতদিন পর্যন্ত না মানুষের মধ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার জ্ঞান না আসবে, ততক্ষণ এসব নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন সাইফুল আলম চৌধুরী।

এখন এমন একটা সময়, যখন কোনো একটি ইস্যুতে মূলধারার গণমাধ্যমের খবরের চেয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ গণমাধ্যমের খবরকে অনেক বেশি ‘জনপ্রিয়তা’ পায়। দেখা যায়, সেই খবরের হয়তো কোনো ভিত্তিই নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর কী করার আছে?

জানতে চাইলে বার্তা২৪ ডটকমের এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নিউজ কখনো ফেক হয় না। যেটা ফেক, সেটা তো নিউজই না। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো শতভাগ নিশ্চিত হয়ে খবর প্রকাশ করা, সাংবাদিকতার নীতির জায়গায় অটল থাকা। তাহলে পাঠকও বিভ্রান্ত হবে না, সে জানবে যে এখানে এসে সঠিক খবর পাবে।’

এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগের একটি খবরের উদাহরণ টেনে আনেন বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার এই পথিকৃৎ। বাংলাকে ব্রিটেনের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে একটি খবর প্রকাশিত হয় বেশকিছু গণমাধ্যমে। অনেক প্রথম সারির গণমাধ্যমেও এটি নিয়ে খবর প্রকাশ হয়েছে। মূলত ফেসবুককেই সোর্স হিসেবে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফেসবুক তো কোনো খবরের সঠিক সোর্স হতে পারে না। এটা প্রাথমিক উৎস হতে পারে। সেখান থেকে সাংবাদিকরা তথ্য পাবেন। কিন্তু সেটা যাচাই-বাছাই করে ছাপতে হবে। ফেসবুকে দেখলাম বলেই তো সেটা সবার জন্য ছেপে দিতে পারি না।’

প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, ‘ফেসবুক থেকে যেটা পাই সেটা হলো ব্যক্তিগত মতামত, সেটা তো খবর নয়। ফেসবুকের একটা পোস্ট আমরা পুরোটা পড়ব। এরপর দেখব এটা অথেনটিক কি না। এটা কিন্তু নিউজ না। এটা পোস্ট। দুইটার গুণগত মান কিন্তু দুই রকম।’

সে কারণে যেকোনো কিছু ছাপার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ভীষণ সাবধানতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দিলেন তিনি। আলমগীর হোসেন বলেন, সোস্যাল মিডিয়ার যুগে একজন পাঠকের জন্য আসল-নকল খবরের মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন। বিশ্বের অনেক গণমাধ্যমই এখন বিশেষভাবে ফিল্টারিং করে দিচ্ছে। তারাই জানিয়ে দিচ্ছে যে কোনটা ফেক নিউজ আর কোনটা আসল। বাংলাদেশেও একসময় এটা চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতিটি গণমাধ্যমকে নীতি অনুসরণের পাশাপাশি দ্রুত নিউজ দেওয়ার জন্য লাফিয়ে ওঠার প্রবণতা বন্ধ করার পরামর্শ দেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, শতভাগ নিশ্চিত হয়ে খবর প্রকাশ করতে হবে, যেন কোনোভাবেই পাঠকের কাছে ভুল বার্তা না পৌঁছে।

গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রসঙ্গে ঢাবির শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, দেশে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর থেকে অনুমোদন পাওয়া এক হাজার সংবাদপত্র আছে। এর কয়টা নিয়মিত প্রকাশিত হয়? যেগুলো প্রকাশিত হয় না, সেগুলোও কিন্তু সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন পায়, সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নিউজপ্রিন্ট আমদানি করে। মানে সেগুলো ব্যবসা ঠিকই করছে, কিন্তু সংবাদপত্র প্রকাশ করছে না। এগুলোর পেছনে কারা আছে, সেটা নিয়ে কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সংবাদ প্রকাশ করছে না। ফলে সাধারণ মানুষেরও জানার কোনো উপায় থাকছে না যে কোনটা আসলেই সংবাদ প্রকাশ করছে আর কোনটা সংবাদের নাম ভাঙিয়ে স্রেফ ব্যবসা করছে।

মূলধারার সাংবাদিকতায় সোস্যাল মিডিয়াকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতার বিষয়ে আলমগীর হোসেনের মতো সাইফুল আলম চৌধুরীও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একইভাবে তিনিও বলেন, সোস্যাল মিডিয়াকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে দ্রুত সবার আগে সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই প্রবণতাই গণমাধ্যমকে ডোবাচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়ায় একটা খবর প্রকাশ হলেই সেটা ছেপে দেওয়া যাবে না, সেটার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। শতভাগ নিশ্চিত হয়েই একটি তথ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সেটাই গণমাধ্যমের কাজ।

গুজব বা ফেক নিউজ প্রতিরোধে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন লেখক, সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আরিফ জেবতিক। তিনি বলেন, ‘এসব গুজব প্রতিরোধে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যত বেশি রেসপনসিভ হবে, তত বেশি গুজব মোকাবিলা করা যাবে। গুজব ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিউত্তর দিয়ে দেয় বা সঠিক তথ্য প্রকাশ করে, তাহলে গুজব রটনাকারীরা সুবিধা করতে পারবে না।’

বিশ্বজুড়েই ফেক নিউজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জানিয়ে আরিফ জেবতিক বলেন, গুগল-ফেসবুক— এরা সবাই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। বিভিন্ন দেশে এ গুজব বা মিথ্যা খবর ছড়ানোর পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে অর্থ ব্যয় করে ফেক নিউজ পাবলিশ করানো হয়। অন্যদিকে ফেসবুক-গুগল-টুইটার এমনভাবে অ্যালগরিদম সেট করে যে বিশেষ শ্রেণির মানুষের কাছে এসব খবর চলে যায়।

মানুষ তার বেড়ে ওঠা, বিশ্বাস, ধর্ম, রাজনৈতিক পরিচয় এসবের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু জিনিস বিশ্বাস করে নেয়। সে চায় আরও মানুষ এটা বিশ্বাস করুক। বা সে আসলে সমমনা মানুষ খুঁজে বের করে। সে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে কী বিশ্বাস করবে। সেই অনুযায়ী তথ্যই সে খোঁজে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম তার কাছে সেসব মানুষ আর সেসব তথ্যকেই নিয়ে যায়। ফলে গুজব ছড়ানো তার জন্য সহজ হয়ে যায় বা মিথ্যা খবরটাই সে বিশ্বাস করতে শুরু করে।

এই অবস্থাকে বিপজ্জনক পর্যায় বলে উল্লেখ করে জনপ্রিয় এই অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। আর এ থেকে উত্তরণের জন্য মূলধারার গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। অনলাইন গণমাধ্যমগুলোর পাশাপাশি ছাপা পত্রিকাগুলোকেও বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা বলেন। সত্য ঘটনা দিয়ে মিথ্যা ঘটনাকে প্রতিহত করার কথাও বলেন তিনি।

আরিফ জেবতিক মনে করেন, গত দুই এক বছর ধরে মানুষও অনেক সচেতন। তারাও চেষ্টা করেন বিশ্বাসযোগ্য অনলাইন মাধ্যমগুলোর খবর বিশ্বাস করতে। কেউ কোনো তথ্য ছড়ালে তারা লিংক খোঁজেন। এমন লিংক, যেগুলো বিশ্বাসযোগ্য। এছাড়া গুগল-ফেসবুকও ফেক নিউজ কিভাবে ছড়ানো বন্ধ করা যায়, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তাই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশাও দেখছেন তিনি।

সে আগামী কয়েকবছর পর হয়তো ফেক নিউজের প্রাদুর্ভাব অনেক কমে যাবে। কিন্তু এখন কী করবেন পাঠক? কোনো ‘নিউজ’ বিশ্বাস করা বা শেয়ার করার আগে সেটি ফেক কি না, তা আরেকটিবার ভাববেন কি?

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

উদয়ন প্রিমিয়ার লীগ ফুটবল টুর্নামেন্ট ফাইনাল খেলা ও পুরস্কার বিতরণ সম্পূর্ণ

সোস্যাল মিডিয়া, ফেক নিউজ ও গণমাধ্যম

আপডেট সময় : ১২:১৬:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১

ঢাকা: আমার বাবার বয়স প্রায় ৭০ বছর। তিনি একজন অবরসপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আরও অনেকের মতো তার এখন অবসর কাটে মোবাইলে ফেসবুকিং করে। স্বভাবতই তিনি ততটা ‘টেকনোলজি ফ্রেন্ডলি’ নন। ফলে পাসওয়ার্ড ঠিক করে দেওয়া, ছবি আপলোড করে দেওয়া বা কারও প্রোফাইল খুঁজে দেওয়ার মতো করণিক কাজগুলো আমাকেই করতে হয়।

Model Hospital

এই কাজ করতে গিয়ে কিছু জিনিস খেয়াল করি। কিছু বিষয় আমার মাথায় ভিন্ন চিন্তার জন্ম দেয়। যেমন— আমার বাবার সঙ্গে ফেসবুকে যাদের বন্ধুত্ব, তারা প্রায় সবাই কর্মজীবনে তার সহকর্মী ছিলেন। শিক্ষিত মানুষ, সরকারি চাকরি করেছেন, দিন-দুনিয়া দেখেছেন। সেই তারাই এখন যা সব শেয়ার দেন ফেসবুকে, সেগুলোকে আমি চোখ বন্ধ করে ‘ফেক’ বলে চিহ্নিত করতে পারি।

যেহেতু ফেসবুক বন্ধুদের শেয়ার করা বিভিন্ন পোস্ট বা পেজের রিকমেন্ডেশন আমার বাবার টাইমলাইনে চলে আসে, তাই সেগুলো আমার চোখে পড়ে। আমি চেষ্টা করি এসব পেজ বা পোস্ট বাবার অ্যাকাউন্ট থেকে আনফলো দিয়ে রাখতে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা তো আর সেটা সম্ভব না। ফলে অনেককিছু বাবার নজরে পড়ে যায়। এর কিছু তিনি বিশ্বাস করেন, কোনোটায় সন্দেহ থাকলে আমাকে ফোন করেন। দুই মেয়ে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত থাকায় অন্তত সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগটুকু তিনি পান।

কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের তো সেই সুযোগটি নেই। তাই ছাপার হরফে, দুয়েকটি ছবি সম্বলিত (হোক না তা এডিট করা) যে খবরই পান, তারা তা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। শুধু তাই না, সেগুলো শেয়ার করে আরও বেশি মানুষকে জানার সুযোগ করে দেন।

এরকম অন্তত ৫০ জনের ফেসবুক টাইমলাইন ঘেঁটে আমি যা দেখতে পেয়েছি, সেগুলোকে সংক্ষেপ করে বললে দাঁড়ায় এমন— কিছু মানুষ আছেন দেশ বা সরকারকে নিয়ে যেকোনো নেতিবাচক খবর বিশ্বাস করেন এবং সেগুলো শেয়ার করেন। এমন না যে তারা সক্রিয়ভাবে সরকারবিরোধী রাজনীতি করেন বা কোনো দলের সদস্য। কিন্তু কোনোভাবে তাদের মাথায় ঢুকে গেছে যে দেশ রসাতলে যাচ্ছে। আর সেটাই বিভিন্ন ‘ভুয়া’ অনলাইন পোর্টালের বা প্রোপাগান্ডা ছড়ায় এমন পোর্টালের খবরের লিংক শেয়ার করে সবাইকে জানান দেন।
বিজ্ঞাপন

আরেক দল আছেন যারা প্রচণ্ডভাবে ধর্মে বিশ্বাসী, সেটা যেকোনো ধর্মেরই হতে পারে। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে তারা নানা ধরনের অতিপ্রাকৃত খবরের কনটেন্ট শেয়ার দেন। যেমন— গাছের পাতায়, মাংসের টুকরায়, গাছের শেকড়ে, মাছের পেটে, ডিমের খোলসে সৃষ্টিকর্তার নাম অঙ্কিত ছবি, যেটা প্রকৃতপক্ষে এডিট করে বা ‘ফটোশপ’ করে বানানো কি না, সেটিও শেয়ার দেওয়ার সময় ভাবেন না তারা। তারা ধর্মীয় এমন বাণীও শেয়ার করে ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন, যেগুলো আদৌ কোনো ধর্মগ্রন্থে রয়েছে কি না, তা যাচাই করার ধারও ধারেন না। ধর্মের নামে সামান্য খারাপ কিছুও তারা সহ্য করতে পারেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত যেকোনো পোস্ট পড়ে আরেকজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেও তারা দ্বিধা করেন না। তা সে কমেন্ট দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াই হোক, আর পাশের বাড়ির ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে আগুন দিয়েই হোক।

আবার অনেকে দেখা যায়, কয়েক বছর আগে কোথাও পাওয়া কোনো মৃতদেহের বা দাঙ্গার ছবিকে নতুন কোনো ঘটনার সঙ্গে জুড়ে শেয়ার করছেন। আরেকদল মানুষ বুঝে না বুঝে সেটি নানা ধরনের জ্বালাময়ী বা বেদনাবিধুর ভাষা দিয়ে শেয়ার করছেন। অনেক ভুইফোঁড় নিউজ পোর্টালও সেগুলো নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে ছেপে দিচ্ছে।

বিষয়টি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, গুজব ছড়ানো হচ্ছে জানিয়ে আলাদা সংবাদ প্রকাশ করতে হয় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে। দিতে হয় গুজবের পাল্টা জবাবও।

কেন মানুষের ভুয়া, মিথ্যা বা গুজবের খবরের প্রতি এত আগ্রহ?

জানতে কথা বলি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি বললেন, গুজবে বিশ্বাস করা মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। কারণ মানুষের মনের একটি অংশই চায় নেতিবাচক খবর বা গুজবে বিশ্বাস করতে।

এই চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষের মনের দুইটি অবস্থা— একটি চেতন মন, অন্যটি অবচেতন। এগুলো আমাদের ইড (Ied) ইগো ও সুপার ইগো দ্বারা পরিচালিত। এই চেতন-অবচেতনের মধ্যে ইড ইগো সবসময় চায় আমাদের কামনা-বাসনাসহ অন্য পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে চরিতার্থ করতে— আমি আমার উদ্দেশ্য হাসিল করব, আমি অনেক কিছু অর্জন করব, আমি টাকা পাব, আমি কাউকে কামনা করব ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে গুজবে মানুষ তার অবদমিত কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার রূপকল্প খুঁজে পায়। যখন এটা গুজব হয়, তার মানে কাউকে আক্রমণ করো, কারও সম্পর্কে খারাপ কিছু বলো, অন্যকে নিচের দিকে কোনোভাবে ঠেলে দাও। এগুলো সামনে পেলে মানুষের মন ইড দ্বারা পরিচালিত হয়। তখন সে সব ধরনের গুজব বিশ্বাস করে। কারণ তার অবচেতন মন সবসময় এ ধরনের বিষয়ই আকাঙ্ক্ষা করে।’

মানুষ সভ্যতার ভেতরে থাকলেও তার মনের ভেতরে কিন্তু জন্মগতভাবেই একটি পাশবিক প্রবৃত্তি থাকে বলে জানান ডা. হেলাল। তিনি বলেন, ইডের প্রভাবে এগুলো ত্বরান্বিত হয়। অবচেতন মনে সে যা চায়, গুজবের মধ্যে সেগুলো পায়। তখন সে গুজবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তা বিশ্বাস করে।

হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এখন আমরা যে লার্নিং প্রসেসের মধ্যে আছি, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা যে লার্নিং প্রসেসের মধ্যে আছে, সেটা শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক বা ইনফরমেশন বেজড। আমরা অনেক বেশি ইনফরমেশন জানি। কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা নলেজ বেজড সোসাইটি কিন্তু আমরা তৈরি করতে পারিনি। তেমন জ্ঞানভিত্তিক সমাজ যদি থাকত, তবে আমরা সত্য-মিথ্যা যাচাই করে জ্ঞান অর্জন করতে পারতাম। কিন্তু আমরা জ্ঞান অর্জন না করে ইনফরমেশনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছি। ইনফরমেশন অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যদি সেটা মিথ্যা হয়। কিন্তু জ্ঞানের ক্ষেত্রে কিন্তু বিপজ্জনক জ্ঞান বলে কিছু নেই। জ্ঞান সবসময় সত্যকেই সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু ইনফরমেশনে সত্যও থাকতে পারে, মিথ্যাও থাকতে পারে।’

এই মনোস্তাত্ত্বিক মনে করেন, মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যেহেতু জ্ঞানভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন করে, তাই তারা সহজে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে না। আজকাল মানুষ সহজ ইনফরমেশন চায়। আর সেটা পায় এসব ভুয়া পোর্টালের কাছে। কারণ তারা সোস্যাল মিডিয়ার ‘উপযোগী’ করে এসব নিউজ তৈরি করে। সেই অনুযায়ী শিরোনাম দেয়, চটক তৈরি করে। সেজন্য তাদের কাছে মানুষ বেশি যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই যে নেতিবাচক খবর বা গুজব ছড়িয়ে পড়া, এ প্রসঙ্গে জানতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরীর কাছে।

ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সে পিএইচডিরত এই শিক্ষক বলেন, গুজব রটানো ঐতিহাসিকভাবে নতুন কিছু না। আগে যখন কোনো যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না, তখন গুজব রটতো বিভিন্ন গ্রামে বা এলাকায়। সাধারণত কোনো জনসমাগম বা জনবহুল এলাকায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেউ একজন গুজব রটিয়ে দিত। এরপর সেটা মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়ত। এখন এই আধুনিক সমাজে যেহেতু সবারই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www) তথা ইন্টারনেটে প্রবেশ করার সুযোগ আছে, তাই গুজব ছড়ানোটা এখন অনেক সহজ। এখন এক ক্লিকেই গোটা দুনিয়ার কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই যে ব্যাপ্তি, এটা যে কতটা বিশাল, সেটা গুজব রটনাকারী যেমন বুঝতে পারছেন না, তেমনি গুজবে বিশ্বাস স্থাপনকারীও বুঝতে পারছেন না।

সাইফুল আলম বলেন, স্বভাবগতভাবেই মানুষ যেহেতু মুখরোচক বিষয় পছন্দ করে, তাই গুজব রটনাকারীরা সুযোগ পেয়ে যায়। আগে যেমন গ্রামে কেউ গুজব ছড়ালে তাকে খুঁজে বের করে গ্রামপ্রধানরা শাস্তি দিতেন, এখনো সেটার চেষ্টা করে বিভিন্ন দেশ। কিন্তু এই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যুগে বিষয়টি ভীষণ কঠিন। কারণ আমাদের এখানে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, সিনেমা হল নেই, নাটকের মঞ্চ নেই, খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই। মানুষ এই অবস্থায় খোঁজে সুলভ বা সস্তা বিনোদন। সেটা সে পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একজন মানুষ চাইলেই ৫ সেকেন্ড থেকে শুরু করে ৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি অনলাইনে থাকতে পারে। সে যেহেতু সস্তা বিনোদন খোঁজে, তাই কে কাকে বিয়ে করল, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক, কে কয়টা প্রেম করছে— এসব খবরে আগ্রহী হয়। সে গুজব ছড়ায় ও গুজবে বিশ্বাস করে।

কোনো কোনো দেশের সরকার ইন্টারনেটেই এসব বিষয়ের প্রাপ্যতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বসাচ্ছে। আবার উন্নত দেশগুলো এক এক করে খুঁজে বের করছে গুজব রটনাকারীদের। সেভাবেই তাদের শাস্তি দিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের অ্যান্টি ফেক নিউজ অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেন গণযোগাযোগের এই শিক্ষক।

এর থেকে উত্তরণের পথ কী— জানতে চাইলে সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, একটা দোকানে ভালো-খারাপ সব ধরনের পণ্যই থাকে। এখন কেউ যদি কমদামে খারাপ জিনিস কেনে, তাহলে সেই পণ্য ব্যবহার করে সে অসুস্থ হতে পারে। তখন চিকিৎসার পেছনে উল্টো বেশি খরচ হবে। অর্থাৎ কমদামে কিনে তিনি যে লাভ করলেন, সেটি আদতে তারই চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, তার মানে একজন মানুষের মধ্যে কী কিনবেন বা কী বিশ্বাস করবেন, তার একটা জ্ঞান থাকতে হবে। এটাকে বলা হচ্ছে মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো স্কুল পর্যায় থেকে এই বিষয়টি কোর্স আকারে পড়াতে শুরু করেছে। এটি কিন্তু সাংবাদিকতা নয়। একজন মানুষ গণমাধ্যমের কোন বিষয়গুলো বিশ্বাস করবেন, কী দেখে মূলধারার গণমাধ্যম বা মিথ্যা খবর চিহ্নিত করবেন, সে বিষয়ক কোর্স।

আমাদের দেশে এই বিষয়টি কোথাও পড়ানো হয় না। ফলে প্রচুর ভুল বানান, ভুল বাক্যগঠন, মূলধারার গণমাধ্যমের নামের আগে পরে ২৪ বা নিউজ ইত্যাদি যোগ করে গজিয়ে ওঠা অনলাইনগুলোর খবরও মানুষ বিশ্বাস করেন, শেয়ার দেন। মিডিয়া লিটারেসি না থাকার কারণেই এসব থেকে অরাজকতা তৈরি হয়, কখনো তা দাঙ্গায় রূপ নেয়। শুধুমাত্র আইন দিয়ে এসব বন্ধ করা সম্ভব না। যতদিন পর্যন্ত না মানুষের মধ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার জ্ঞান না আসবে, ততক্ষণ এসব নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন সাইফুল আলম চৌধুরী।

এখন এমন একটা সময়, যখন কোনো একটি ইস্যুতে মূলধারার গণমাধ্যমের খবরের চেয়ে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ গণমাধ্যমের খবরকে অনেক বেশি ‘জনপ্রিয়তা’ পায়। দেখা যায়, সেই খবরের হয়তো কোনো ভিত্তিই নেই। সেখানে দাঁড়িয়ে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর কী করার আছে?

জানতে চাইলে বার্তা২৪ ডটকমের এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নিউজ কখনো ফেক হয় না। যেটা ফেক, সেটা তো নিউজই না। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো শতভাগ নিশ্চিত হয়ে খবর প্রকাশ করা, সাংবাদিকতার নীতির জায়গায় অটল থাকা। তাহলে পাঠকও বিভ্রান্ত হবে না, সে জানবে যে এখানে এসে সঠিক খবর পাবে।’

এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগের একটি খবরের উদাহরণ টেনে আনেন বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার এই পথিকৃৎ। বাংলাকে ব্রিটেনের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে একটি খবর প্রকাশিত হয় বেশকিছু গণমাধ্যমে। অনেক প্রথম সারির গণমাধ্যমেও এটি নিয়ে খবর প্রকাশ হয়েছে। মূলত ফেসবুককেই সোর্স হিসেবে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফেসবুক তো কোনো খবরের সঠিক সোর্স হতে পারে না। এটা প্রাথমিক উৎস হতে পারে। সেখান থেকে সাংবাদিকরা তথ্য পাবেন। কিন্তু সেটা যাচাই-বাছাই করে ছাপতে হবে। ফেসবুকে দেখলাম বলেই তো সেটা সবার জন্য ছেপে দিতে পারি না।’

প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, ‘ফেসবুক থেকে যেটা পাই সেটা হলো ব্যক্তিগত মতামত, সেটা তো খবর নয়। ফেসবুকের একটা পোস্ট আমরা পুরোটা পড়ব। এরপর দেখব এটা অথেনটিক কি না। এটা কিন্তু নিউজ না। এটা পোস্ট। দুইটার গুণগত মান কিন্তু দুই রকম।’

সে কারণে যেকোনো কিছু ছাপার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ভীষণ সাবধানতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দিলেন তিনি। আলমগীর হোসেন বলেন, সোস্যাল মিডিয়ার যুগে একজন পাঠকের জন্য আসল-নকল খবরের মধ্যে পার্থক্য করা খুব কঠিন। বিশ্বের অনেক গণমাধ্যমই এখন বিশেষভাবে ফিল্টারিং করে দিচ্ছে। তারাই জানিয়ে দিচ্ছে যে কোনটা ফেক নিউজ আর কোনটা আসল। বাংলাদেশেও একসময় এটা চালু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রতিটি গণমাধ্যমকে নীতি অনুসরণের পাশাপাশি দ্রুত নিউজ দেওয়ার জন্য লাফিয়ে ওঠার প্রবণতা বন্ধ করার পরামর্শ দেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, শতভাগ নিশ্চিত হয়ে খবর প্রকাশ করতে হবে, যেন কোনোভাবেই পাঠকের কাছে ভুল বার্তা না পৌঁছে।

গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রসঙ্গে ঢাবির শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, দেশে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর থেকে অনুমোদন পাওয়া এক হাজার সংবাদপত্র আছে। এর কয়টা নিয়মিত প্রকাশিত হয়? যেগুলো প্রকাশিত হয় না, সেগুলোও কিন্তু সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞাপন পায়, সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নিউজপ্রিন্ট আমদানি করে। মানে সেগুলো ব্যবসা ঠিকই করছে, কিন্তু সংবাদপত্র প্রকাশ করছে না। এগুলোর পেছনে কারা আছে, সেটা নিয়ে কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সংবাদ প্রকাশ করছে না। ফলে সাধারণ মানুষেরও জানার কোনো উপায় থাকছে না যে কোনটা আসলেই সংবাদ প্রকাশ করছে আর কোনটা সংবাদের নাম ভাঙিয়ে স্রেফ ব্যবসা করছে।

মূলধারার সাংবাদিকতায় সোস্যাল মিডিয়াকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতার বিষয়ে আলমগীর হোসেনের মতো সাইফুল আলম চৌধুরীও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। একইভাবে তিনিও বলেন, সোস্যাল মিডিয়াকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে দ্রুত সবার আগে সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই প্রবণতাই গণমাধ্যমকে ডোবাচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়ায় একটা খবর প্রকাশ হলেই সেটা ছেপে দেওয়া যাবে না, সেটার সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। শতভাগ নিশ্চিত হয়েই একটি তথ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সেটাই গণমাধ্যমের কাজ।

গুজব বা ফেক নিউজ প্রতিরোধে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেন লেখক, সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আরিফ জেবতিক। তিনি বলেন, ‘এসব গুজব প্রতিরোধে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যত বেশি রেসপনসিভ হবে, তত বেশি গুজব মোকাবিলা করা যাবে। গুজব ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিউত্তর দিয়ে দেয় বা সঠিক তথ্য প্রকাশ করে, তাহলে গুজব রটনাকারীরা সুবিধা করতে পারবে না।’

বিশ্বজুড়েই ফেক নিউজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জানিয়ে আরিফ জেবতিক বলেন, গুগল-ফেসবুক— এরা সবাই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। বিভিন্ন দেশে এ গুজব বা মিথ্যা খবর ছড়ানোর পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে অর্থ ব্যয় করে ফেক নিউজ পাবলিশ করানো হয়। অন্যদিকে ফেসবুক-গুগল-টুইটার এমনভাবে অ্যালগরিদম সেট করে যে বিশেষ শ্রেণির মানুষের কাছে এসব খবর চলে যায়।

মানুষ তার বেড়ে ওঠা, বিশ্বাস, ধর্ম, রাজনৈতিক পরিচয় এসবের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু জিনিস বিশ্বাস করে নেয়। সে চায় আরও মানুষ এটা বিশ্বাস করুক। বা সে আসলে সমমনা মানুষ খুঁজে বের করে। সে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যে কী বিশ্বাস করবে। সেই অনুযায়ী তথ্যই সে খোঁজে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদম তার কাছে সেসব মানুষ আর সেসব তথ্যকেই নিয়ে যায়। ফলে গুজব ছড়ানো তার জন্য সহজ হয়ে যায় বা মিথ্যা খবরটাই সে বিশ্বাস করতে শুরু করে।

এই অবস্থাকে বিপজ্জনক পর্যায় বলে উল্লেখ করে জনপ্রিয় এই অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। আর এ থেকে উত্তরণের জন্য মূলধারার গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। অনলাইন গণমাধ্যমগুলোর পাশাপাশি ছাপা পত্রিকাগুলোকেও বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা বলেন। সত্য ঘটনা দিয়ে মিথ্যা ঘটনাকে প্রতিহত করার কথাও বলেন তিনি।

আরিফ জেবতিক মনে করেন, গত দুই এক বছর ধরে মানুষও অনেক সচেতন। তারাও চেষ্টা করেন বিশ্বাসযোগ্য অনলাইন মাধ্যমগুলোর খবর বিশ্বাস করতে। কেউ কোনো তথ্য ছড়ালে তারা লিংক খোঁজেন। এমন লিংক, যেগুলো বিশ্বাসযোগ্য। এছাড়া গুগল-ফেসবুকও ফেক নিউজ কিভাবে ছড়ানো বন্ধ করা যায়, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তাই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশাও দেখছেন তিনি।

সে আগামী কয়েকবছর পর হয়তো ফেক নিউজের প্রাদুর্ভাব অনেক কমে যাবে। কিন্তু এখন কী করবেন পাঠক? কোনো ‘নিউজ’ বিশ্বাস করা বা শেয়ার করার আগে সেটি ফেক কি না, তা আরেকটিবার ভাববেন কি?