চাঁদপুরে গরুর লাম্পি স্কিন রোগ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা
সামনে কোরবানীর ঈদ। তার আগেই চাঁদপুরে হানা দিয়েছে গরুর লাম্পি স্কিন রোগ। প্রথমে গরুর জ্বর ও ব্যথা শুরু হয়। খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি হয়, পরে ফসকা উঠে চামড়াগুলো ঝরে পড়ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখা যায় পশু চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে আক্রান্ত গরু বা বাছুরকে আলাদা স্থানে মশারী ভিতর রাখা হচ্ছে।

জেলার মধ্যে কচুয়া-হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জে সবচেয়ে বেশি লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত গরু ও বাছুর। পশু হাসপাতালে নেয়া শতকরা ৭০-৮০ ভাগ গরু ও গরুর বাছুরের ধরা পড়ছে লাম্পি স্কিন রোগ। শূণ্য থেকে ৪ বা ৬ মাসের ছোট বাছুর গুলো আক্রান্ত বেশি। মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি বাছুরগুলোর। এই ভাইরাসটি মশা-মাছি থেকে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময়ে চিকিৎসা ও ব্যায়-বহুল খরচ এবং ভ্যাকসিন সংকট নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক খামারিরা।

কচুয়া উপজেলার খামারি আব্দুল্লাহ বলেন, আমার বড় তিনটা গরুর সমস্যা হইছে। এদের সমস্যা হওয়ার পরে চিকিৎসা নিয়ে বড় তিনটা গরু সুস্থ হইছে। কিন্তু এখন বাচ্চাগুলা নিয়া আতংকে আছি। আশেপাশের প্রতি বাড়িতেই, প্রতি ঘরে ঘরেই লাম্পি স্কিন নামের রোগটা দেখা দিচ্ছে। লাম্পি স্কিন বাচ্চাদের হওয়ার পরে এই বাচ্চাগুলাকে আর বাঁচানো যায় না।

আরেক খামারি নেছার আহমেদ বলেন, আমার খামারেও দেখা দিছে এই রোগ। পাশাপাশি দেখছি এলাকার অন্যান্য খামারেও এই রোগটা দেখা দিয়েছ। আমরা এখন এই রোগটা নিয়ে অনেক হতাশাগ্রস্ত আছি। সামনে কুরবানীর ঈদ চলে আসছে এবং বড়গুলো তো হচ্ছেই আমরা ছোট বাছুরগুলো নিয়ে চিন্তায় আছি। যদি আমরা সরকারের পক্ষ থেকে ভ্যাক্সিনের কোনো সহযোগীতা পেতাম, তাহলে হয়তো আমরা সবাই অনেক উপকৃত হতাম, চিন্তামুক্ত হতাম।

ফরিদগঞ্জ উপজেলার খামারি লিটন বলেন, গরুর প্রথমে জ্বর আসছে। জ্বর থেকেই ঠান্ডা, তারপর আস্তে আস্তে গরুর পুরো শরীরে গোটা গোটা হয়ে ফুলে গেছে। তারপর গরু অসুস্থ হয়ে গেছে। পশু হাসপাতালের ডাক্তার এসে চিকিৎসা করছে। এখন গরুগুলো সুস্থ হইছে।
চাঁদপুর জেলা প্রাণি সম্পদ ও ভেটেনারী হাসপাতালের উপ-সহকারী কর্মকর্তা ডা. মো. শামীম তালুকদার জানান, লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগে আক্রান্ত গরুগুলো রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
তিনি আরও জানান, মাঠ পর্যায়ে এবং হাসপাতালে বর্হিবিভাগের যে গরু আসে বিশেষ করে এই গরুগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০-৮০% রোগে আক্রান্ত। আর এই লাম্পি স্কিনের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। ০ থেকে ৪ বা ৬ মাসের যে ছোট বাছুর গুলো এগুলা ম্যাক্সিমাম মারা যাচ্ছে। আর এর উপরের বয়সের গুলোর মৃত্যুর হার কম কিন্তু এগুলো বেঁচে থাকলেও আর আগের মতো হয় না। কারণ এই রোগটা যেহেতু ভাইরাসজনিত রোগ, ওদের ইমিউনিটিকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে দেখা গেছে যে একটা বাড়ন্ত প্রাণী যে পরিমাণ বাড়ার কথা সে পরিমাণ বাড়ে না। আর এর চিকিৎসা ব্যয় অনেক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় এগুলা মারা যায়।
শামীম তালুকদার বলেন, এভাবে আমাদের ক্ষুদ্র যে খামারিরা যারা ভ্যাক্সিনটা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে সেটা করতে পারে না। এই কারণে তারা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, জেলায় গরুর লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত ১৬৫ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। যখন মশা-মাছির উপদ্রব্য বেশি থাকে তখন এটা ছড়ায় বেশি। নতুন করে ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে। তাছাড়া কিছু ভ্যাকসিন ইনপুট করছে সরকার। এ ভ্যাকসিন আগামী ২/১ মাসের মধ্যে প্রয়োগ শুরু হবে বলে আশ্বাস দেন জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা।
চাঁদপুর জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. জ্যোর্তিময় ভৌমিক জানান, এই অর্থ বছরে এই পর্যন্ত আমরা ১৬৫ এলাকায় লাম্পি স্কিন ডিজিস ভাইরাসের অকারেন্সটা চিহ্নিত করেছি। এই পর্যন্ত বাছুরগুলো বেশি আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় ৪৫টি বাছুর মৃত্যুবরণ করেছে। যখন মশা-মাছির উপদ্রব্য বেশি থাকে তখন এটা ছড়ায় বেশি।
তিনি আরও বলেন, সাধারণত চাঁদপুরে প্রতিটা উপজেলায় লাম্পি স্কিন ডিজিস ভাইরাস আছে। সবচেয়ে বেশি হলো- যেসব এলাকায় গরুর পপুলেশন বেশি যেমন কচুয়া-হাজীগঞ্জ-ফরিদগঞ্জে এসব এলাকায় লাম্পি স্কিন ডিজিস বেশি আছে। আশা করি এটা পরবর্তীতে আমাদের নতুন করে ভ্যাকসিন তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের লোকাল যে স্ট্যানের ভ্যাকসিনটা এটা তৈরি হবে। এটা আমরা মাচ ভ্যাকসিনেশন করতে পারবো। তাছাড়া কিছু ইনপুটে ভ্যাকসিন ইনপুট করতেছে ইমারজের্ন্সি। এটা ইমডিয়েটলি চলে আসবে। ১/২ মাসের মধ্যে। মাচ ভ্যাকসিন হলে এটার প্রকোট আমরা নির্মূল করতে পারবো।
এদিকে চাঁদপুরের আট উপজেলার প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক খামার গুলোতে পালিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ গরু। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম গরুর এই রোগ ধরা পড়লেও এবার চাঁদপুরে এর প্রকোপ বেশি বলে জানান চিকিৎসকরা।






