ইছাপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা
স্মার্টফোন ছেড়ে খেলাধুলা ও ভালো কাজে যুক্ত হওয়ার আহ্বান ইউএনও মনিরা খাতুনের
শাহরাস্তিতে ৮০ বছর পুরোনো বৃহত্তর টামটা উত্তর ইউপির প্রথম উচ্চ বিদ্যালয় ইছাপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ এবং কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোঃ রিয়াজুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনিরা খাতুন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও মনিরা খাতুন শিক্ষার্থীদের বাবা-মা ও শিক্ষকদের কথা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাবা-মায়ের পর শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব পালন করেন। তাই শিক্ষকদের অভিভাবকত্বে থেকে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আজ কী ভালো কাজ করা যায়, সে চিন্তা করতে হবে। ভালো কাজের অভ্যাস পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।

তিনি বলেন, মাকে রান্নাঘরের কাজে সহযোগিতা করা, সংসারের কাজে অংশ নেওয়া, বিদ্যালয়ে এসে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার রাখা, বন্ধু কিংবা বড়দের আগে সালাম দেওয়া, অপরিষ্কার বেঞ্চ বা পড়ে থাকা কাগজের প্যাকেট নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করার মতো ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই ভালো অভ্যাস গড়ে ওঠে। ভালো কাজেও সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা উচিত। কে আগে ভালো কাজ করতে পারে, কে আগে অন্যকে সালাম দিতে পারে কিংবা কে আগে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করতে পারে, এসব নিয়েও প্রতিযোগিতা হতে পারে। খারাপ কাজ এড়িয়ে ভালো কাজের চর্চা এবং ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা যে যার ধর্মের অনুসারী, সেই ধর্মের নিয়ম-কানুন ও অনুশাসন মেনে চলব। সব ধর্মই শান্তি ও ভালো কাজের শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মীয় চর্চার পাশাপাশি ভালো কাজের চর্চা করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানিয়ে ইউএনও বলেন, স্কুলে পড়াশোনাই শিক্ষার্থীদের প্রধান দায়িত্ব। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজের একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী এখন থেকেই ভবিষ্যতে কী হতে চায় তা ঠিক করবে। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা করবে।
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রসঙ্গে মনিরা খাতুন বলেন, শিক্ষার্থীরা বর্তমানে বাবা-মায়ের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে এবং প্রযুক্তিকে ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করতে হবে। প্রযুক্তি নিজে খারাপ নয়, তবে এর অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে এবং নেতিবাচক পথে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ও বিভিন্ন ডিভাইস থেকে দূরে রাখতে সামাজিকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। মাঝে মাঝে শ্রেণিভিত্তিক ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করা যেতে পারে। বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। অষ্টম ও নবম শ্রেণির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করলেও শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। খেলাধুলা ও সামাজিক কাজে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা গেলে তারা ধীরে ধীরে ডিভাইস থেকে দূরে আসবে।
অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্তানকে শুধু মোবাইল ফোন থেকে দূরে থাকার কথা বললেই হবে না, বাবা-মাকেও নিজেদের আচরণের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে হবে। একজন বাবা যদি সারাদিন মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন অথচ সন্তানকে ফোন ব্যবহার না করার কথা বলেন, তাহলে তা কার্যকর হবে না। তাই বাবা-মাকে আগে নিজের ফোনটি পাশে রেখে সন্তানের পাশে বসতে হবে এবং তাকে সময় দিতে হবে। এ সময়কে ‘কোয়ালিটি টাইম’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাবা-মা সন্তানকে গুণগত সময় দিলে সন্তানও ইতিবাচকভাবে গড়ে উঠবে।
ইউএনও বলেন, আজকের শিশুরাই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার রূপকার। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহমর্মিতার বোধ তৈরি করে।
কৃতি শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, “কৃতি শিক্ষার্থীদের এই অর্জন তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে আরও বড় সাফল্যের অনুপ্রেরণা জোগাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পাশে থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহরাস্তি উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মোঃ আবু ইউসুফ (রূপন) পাটোয়ারী,উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, ইছাপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক আলহাজ্ব মোঃ রফিকুল আলম (তনু), বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা, ইকরামুল হাওলাদার রহিম ও বিএনপি নেতা রবিউল আলম।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম কিবরিয়া বিদ্যালয়ের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তাদের মেধা, মনন ও শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চা অত্যন্ত জরুরি। আজকের কৃতি শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে সমাজ ও দেশের নেতৃত্ব দেবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন।
সভাপতির বক্তব্যে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোঃ রিয়াজুল কুদ্দুস বলেন, ইছাপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ বজায় রাখতে পরিচালনা কমিটি সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। বার্ষিক প্রতিযোগিতা ও কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনার মতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে অনুপ্রাণিত করবে। ভবিষ্যতেও বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও শিক্ষাগত মানোন্নয়নে সহযোগিতার ধারা অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠান শেষে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্য অর্জনকারী কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।
পরে ইউএনও মনিরা খাতুন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘স্যানোরা’ ব্র্যান্ডের স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।





