শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

হুমকির মুখে স্কুল মাদ্রাসা মসজিদ ও কবরস্থান

মেঘনা ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন আতঙ্কে ৩ হাজার বাসিন্দা

নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: রবিবার, ৪ মে, ২০২৫, ১০:৪৩ পিএম
মেঘনা ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন আতঙ্কে ৩ হাজার বাসিন্দা
মেঘনা ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গন আতঙ্কে দিনযাপন করছেন মতলব উত্তর সুলতানাবাদ চরলক্ষীপুর গ্রামের তিন হাজার সাধারণ মানুষ। ইতিমধ্যে ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক বসতঘর, ফসলি জমি ও পারিবারিক কবরস্থান।
হুমকির মুখে পড়েছে গ্রামের একমাত্র স্কুল চরলক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই গ্রামে একটিমাত্র মাদ্রাসা ও মাজার রয়েছে যেটি প্রায় বিলীন হওয়ার পথে।
সরে জমিনে গিয়ে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর যাবত ধীরে ধীরে ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে চরলক্ষীপুরের কয়েক শত একর ফসলি জমি। নদীবেষ্টিত চরলক্ষীপুরের অধিকাংশ মানুষই কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই নদী ভাঙ্গনের কারণে এখানকার কৃষকরা প্রায় সর্বশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি যত দ্রুত সম্ভব কোন রকম ভাবে হলেও গ্রামবাসীকে নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করা।
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম প্রধান, কামরুজ্জামান রিপন, আলাউদ্দিন প্রধান ও মামুন প্রধান জানান, দীর্ঘদিন যাবত আমরা ধনাগোদা নদীর ভাঙ্গনের শিকার হচ্ছি। এই তিন মাস যাবত ভাঙ্গনের তীব্রতা বেড়েছে। আমাদের অনেক ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন বসতভিটা নিয়ে আমরা আতংকে দিন যাপন করছি।
জমি জমাতে ফসলাদি করে আমাদের দিন চলে। সেই ফসলী জমিটুকুও নদীতে বিলীন হয়ে আমরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছি। এই অবস্থায় সরকার যদি আমাদের বসত ভিটে টুকু রক্ষা করার ব্যবস্থা করে দেয়। তাহলে মাথা গুজার মত একটু জায়গা থাকে।
এখানকার মানুষের শহরে বা অন্য কোথাও গিয়ে জমি কিনে বসতি করার সামর্থ্য অনেকেরই নেই।
স্থানীয় মুরুব্বী আলহাজ্ব কাজি নাসির উদ্দীন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ইলিয়াস প্রধান ও আলহাজ্ব আব্দুল কাদির প্রধান বলেন, চরলক্ষ্মীপুর গ্রামটি একেবারে নদীবেষ্টিত। এই গ্রামের চতুর্দিকেই নদী। এখানে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে একটি স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, মাজার ও ঈদগা রয়েছে। নদী ভাঙ্গনের যে তীব্রতা দেখা দিয়েছে তাতে গ্রামের সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। মাদ্রাসা ও ঈদগাহের একেবারে পাশেই নদী চলে এসেছে। যেকোনো সময় গ্রামের ঈদগাহ ময়দান টি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এই ভাঙ্গন প্রতিরোধে আমরা উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট অফিসে কতবার আবেদন করেছি। কিন্তু কোন প্রতিকার পাইনি।
সুলতানাবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী প্রধান প্রধান বলেন, আমি চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া আমাদের এমপি ছিলেন। ওনাকে একাধিকবার বলার পরেও উনি শুধু আশ্বাস দিয়ে গেছেন। কিন্তু নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এভাবে ভাঙতে থাকলে গ্রামটি প্রায় বিলিন হয়ে যাবে।
চরলক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি এ এইচ এম জামাল সাকিব বলেন, পুরো গ্রামবাসীর জন্য এই একটি মাত্র স্কুল রয়েছে এখানে। নদী ভাঙতে ভাঙতে প্রায় স্কুলের কাছে চলে এসেছে। স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে স্কুল ও গ্রামবাসীকে রক্ষা করা যাবে না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ যত দ্রুত সম্ভব এই গ্রামটিকে রক্ষা করতে নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড মেঘনা ধনাগোদার নির্বাহী প্রকৌশলী সেলিম শাহেদ জানান, বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। আমি নিজে সেখানে যাব। সেখানকার পরিস্থিতি দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’