শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

চাঁদপুরে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে ‘মৃত’ দেখিয়ে স্ত্রী’র দীর্ঘদিন ভাতা উত্তোলন!

নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: বুধবার, ৭ মে, ২০২৫, ৮:২১ পিএম
চাঁদপুরে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে ‘মৃত’ দেখিয়ে স্ত্রী’র দীর্ঘদিন ভাতা উত্তোলন!

চাঁদপুর শহরের মিশন রোড, চন্দনা রায়ের বাড়ির তৃতীয় তলায় (আশ্রমের পাশে) বীর মুক্তিযোদ্ধা সুজন তালুকদার এখনো জীবিত, তবে সরকারি নথিপত্রে তিনি ‘মৃত’।

এই ‘মৃত’ পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তার স্ত্রী অসীমা তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই প্রতারণার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে গত ৬ মে (মঙ্গলবার), যখন চিত্রলেখা মোড়ে অবস্থিত সোনালী ব্যাংক শাখায় অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মাহবুব আলম জানান, “আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী, সুজন তালুকদার মৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত। তার স্ত্রী নিয়মিতভাবে ভাতা উত্তোলন করছেন।” তিনি আরও জানান, ওই শাখা থেকে মোট ৩৯৫ জন মৃত মুক্তিযোদ্ধার ওয়ারিশরা নিয়মিতভাবে ভাতা উত্তোলন করছেন।

সরকারি ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম’-এও সুজন তালুকদারকে মৃত দেখানো হয়েছে। তার মুক্তিযোদ্ধা নম্বর: ০১১৩০০০১৬০২ এবং গেজেট নম্বর: ৫৫। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বর্তমানে জীবিত আছেন।

Model Hospital

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সুজন তালুকদার যখন প্রবাসে ছিলেন, সেই সময় স্ত্রী অসীমা তালুকদার বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে স্বামীকে গৃহবন্দি করে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, পরকীয়া এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

ভাতিজি বিপাশা তালুকদার বলেন, “আমার কাকাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। সরকারি নথিতে তাকে মৃত দেখিয়ে তার নামে ভাতা তুলে নিচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে, সে কাকাকে সরিয়ে দিয়ে সম্পত্তি দখলের চেষ্টাও করছে।”

ঘটনার পর চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা বিনয় ভূষণ মজুমদার, আমিনুর রহমান ও বাসুদেব মজুমদার বলেন, “এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় ভাতা আত্মসাৎ করাটা একটি ভয়ানক অপরাধ। আমরা দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

এ বিষয়ে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন জানান, “অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবিলম্বে ভাতা বন্ধ করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজনে তাদের পুরস্কৃতও করা হবে।”

অভিযুক্ত অসীমা তালুকদার দাবি করেন, তিনি শিগগির ঢাকায় যাচ্ছেন এবং স্বামী সুজন তালুকদারকে আত্মীয়দের জিম্মায় রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। তবে ভাতার টাকা কীভাবে খরচ হয়েছে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক চাঁদপুর পালেরবাজার শাখা থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব সুজন তালুকদারের একাউন্ট থেকে জমানো টাকা অসুস্থতার অজুহাতে চিকিৎসার নাম করে সকল প্রতিষ্ঠানের চোখে ধুলা দিয়ে অর্থের বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নিচ্ছেন অসীমা তালুকদার।

তিনি যেখানে সুজন তালুকদারকে মৃত দেখালে লাভ হবে সেখানে মৃত দেখাচ্ছেন যেখানে জীবিত দেখালে লাভ হবে সেখানে জীবিত দেখাচ্ছেন। এইভাবে উনি প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করেই চলেছে । মুক্তিযোদ্ধার সকল সম্পদ নিজ নামে কুক্ষিগত করে পরকীয়া প্রেমিকের সাথে উধাও হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকেএগোচ্ছে অসীমা তালুকদার।

চাঁদপুর শহরে এই ঘটনা এখন আলোচনা ও ক্ষোভের কেন্দ্রে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, “একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এমন অবমাননা শুধু আইনগত অপরাধ নয়, এটি জাতির সম্মান ও আত্মমর্যাদার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপমান। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ প্রতারণার পথ খুলে যাবে।”

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’