শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

সাক্ষীরা জানেন না তারা সাক্ষী!

নিজস্ব প্রতিনিধি প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ মে, ২০২৫, ১১:১৯ পিএম
সাক্ষীরা জানেন না তারা সাক্ষী!
জমি থেকে মাটি কাটার সময়ে ভেক্যুর আঘাতে আহত হয়ে পা ভেঙ্গে যায়, বুকের পাজরে আঘাত প্রাপ্ত হন তিনি। তাতেই কার্যসিদ্ধি, অর্থনৈতিক লেনদেনের ঘটনা নিয়ে বিরোধকে পুঁজি করে সেই আঘাতকে হামলা পূর্বক আহত করার ঘটনায় রূপান্তরিত করে আদালতে মামলা দায়ের হয়।
বিজ্ঞ আদালত দায়েরকৃত অভিযোগটি নথিভুক্ত করে থানা পুলিশকে তদন্ত করতে নিদের্শনা দেন। থানার তদন্তকারী কর্মকর্তাও বাদীর দেয়া লিখিত অভিযোগের আলোকে তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করেন। কিন্তু বিপত্তি বাধে ঘটনাস্থল ও সাক্ষীদের নিয়ে। সাক্ষীদের বেশ কয়েকজনের দাবি তারা এই সর্ম্পকে জানেন না এমনকি ঘটনাস্থল হিসেবে যেই স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাও সঠিক নয়। এমন ঘটনাটি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার।
জানা গেছে, উপজেলার সুবিদপুর পূর্ব ইউনিয়নের ফনিসাইর গ্রামের হোসেন রাজা পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের কড়ৈতলী গ্রামের ফয়সাল পাটওয়ারীর নিকটাত্মীয়। সেই সূত্র ধরে ফয়সাল পাটওয়ারী হোসেন রাজার সাথে কয়েক বছর পূর্বে মাটি বিক্রির চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী হোসেন রাজা ফয়সাল পাটওয়ারীকে ২৯ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা দেননি। এক পর্যায়ে এই টাকা আদায়ে ফয়সাল আদালতের দারস্থ হন। যা এখনো আদালতে চলমান।
চলতি বছরের শুরুতেই কামতা এলাকায় মাটি ভেক্যু দিয়ে মাটি কাটার সময়ে অসবাধনতা বশত: ভেক্যুর হাতলের আঘাতে হোসেন রাজার পা ভেঙ্গে যায় এবং বুকের পাজরে আঘাত প্রাপ্ত হন। ওই ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সুবিদপুর পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্বাস আলী।
কিন্তু হোসেন রাজা এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারী পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়নের জামতলা বাজারে সকাল ৭টায় ফয়সাল পাটওয়ারী তার সঙ্গীরা তার উপর হামলা করে এবং এসএস পাইপ দিয়ে আঘাত করে  যাতে তার পা ভেঙ্গে যায় এবং বুকের পাজরে আঘাত প্রাপ্ত হন। এমন অভিযোগ এনে তিনি চাঁদপুর আদালতে গত ১৩মার্চ ২০২৫ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত অভিযোগটি বিবেচনা করে থানা পুলিশকে নথিভূক্ত করে তদন্ত করার নিদের্শনা দেন। এমনটিই জানান মামলার বিবাদী ফয়সাল পাটওয়ারী। তিনি জানান, তার পাওনা টাকা না দিতে এবং আদালতে মামলা করায় বিক্ষুব্ধ হয়ে তিনি দুর্ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করেন।
খোজ নিয়ে জানা যায়, গত ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টায় জামতলা বাজারে এমন কোন ঘটেই নি। মামলার ঘটনাস্থল জামতলা বাজারের ব্যবসায়ী মো. রাব্বী তালুকদার ওই ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না। তিনি জানান, হোসেন রাজা তার পরিচিত প্রায়শই তার দোকানে চা খেতে আসেন। কিন্তু তার উপর হামলার ঘটনা কোন কিছুই জানেন না। তার কাছে কোন পুলিশ আসে নি।
মামলার প্রথম সাক্ষী মো. হানিফ দর্জি জানান, হোসেন রাজা বেশ কিছুদিন ধরে মামলা সাক্ষী তৈরি করে দিতে অনেকদিন তার পিছনে ঘুরেছেন এবং তার মুঠোফোনে কলও করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি বিরক্ত হয়ে তার কল রিসিভ করা বন্ধ করেন। একদিন তার বাড়িতে এসে হাজির হন হোসেন রাজা। তিনি অনেকটা কাকুতি মিনতে করে একটি কাগজে স্বাক্ষর নেন। কেন স্বাক্ষর নিয়েছেন সেই বিষয়ে কিছুই বলেন নি। এছাড়া এই পর্যন্ত কোন পুলিশ মামলার বিষয়ে জানেত আসেন নি। হোসেন রাজার উপর হামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
আরেক সাক্ষী মো. মমিন জানান, মামলার বিষয়ে জানি। কিন্তু কোন কাগজে স্বাক্ষর দেয়নি। সাক্ষীর দেয়ার বিষয়ে আমি জানি না।

মামলার বিবাদী ফয়সাল পাটওয়ারী জানান, পাওনা টাকা না দিয়ে হোসেন রাজা আমাদের মিথ্যা মামলা ফাঁসিয়েছে। সুবিদপুর পূর্ব ইউনিয়নের কামতা এলাকায় তিনি ভেক্যুর আঘাতে আহত হন। কিন্তু  তিনি আমার ও আমার বাবার বিরুদ্ধে মামলা সাজাতে গিয়ে ওই আহত হওয়ার ঘটনাকে তার শশুরবাড়ি যাওয়ার পথে জামতলা বাজারে আমরা তার মোটর সাইকেল গতিরোধ করে হামলা করেছি বলে মিথ্যা ঘটনা সাজায়। এমনকি সাক্ষীরাও জানেন না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে না এসেই বাদীর কথামতো তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছেন বলে শুনেছি।
মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা ফরিদগঞ্জ থানার এসআই রাকিব উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, মামলার অভিযোগ ও চিকিৎসকের সনদ অনুযায়ী তদন্ত করে যা পেয়েছি সেভাবে রিপোর্ট দিয়েছি। তবে সাক্ষীরা যদি মনে করেন তাদের বক্তব্য সঠিক ভাবে উপস্থাপিত হয়নি, তাহলে তারা বৈরি সাক্ষী হিসেবে আদালতে তাদের বক্তব্য দিতে পারেন। এই বিষয়ে মামলা (সি আর ২৫০/২০২৫ )’র বাদী হোসেন রাজা মুঠো ফোনে জানান, আমার উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেই আলোকে আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’