শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

হাজীগঞ্জ বাজারে হকার বসলেই মালামাল যাবে এতিমখানায়: জেলা প্রশাসক মোহসীন

মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন প্রকাশিত: শনিবার, ২ আগস্ট, ২০২৫, ৮:৪৪ পিএম
হাজীগঞ্জ বাজারে হকার বসলেই মালামাল যাবে এতিমখানায়: জেলা প্রশাসক মোহসীন

হাজীগঞ্জ বাজারের চলমান অবস্থা সরেজমিনে দেখতে গিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে হকার বসা ঠেকাতে প্রশাসন এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে গেছে। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “ফুটপাতে কেউ হকারি করতে এলে তার দোকান, পণ্যসামগ্রী জব্দ করে এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হবে।”

শনিবার (২ আগস্ট) বিকেলে হাজীগঞ্জ বাজারের চলমান অবস্থা সরেজমিনে দেখতে গিয়ে এই হুঁশিয়ারি দেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনীর কর্নেল মোয়াজ্জেম হোসেন, পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব, হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইবনে আল জায়েদ হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাবেদ হোসেন চৌধুরীসহ জেলার ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা হকারদের দেড় মাস সময় দিয়েছিলাম বিকল্প স্থানে চলে যাওয়ার জন্য। আমরা তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছি। এবার কঠোরভাবে নিয়ম মানাতে হবে।”

গত ১ আগস্ট থেকে হাজীগঞ্জ বাজারের চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের ফুটপাতগুলো হকারমুক্ত রাখা হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযান এবং সেনাবাহিনী-পুলিশের নিয়মিত টহলে ইতোমধ্যে বাজার এলাকায় শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। সাধারণ পথচারীদের মুখে ফিরেছে হাসি, কারণ হাঁটতে পারছেন নির্বিঘ্নে। যানজটও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

Model Hospital

হাজীগঞ্জ বাজারে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ কেনাকাটা করতে আসে। আগে ফুটপাতে হকারদের কারণে রাস্তার দুই পাশে পথচারীরা হাঁটতে পারতেন না। যানজট ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এখন বদলে যাচ্ছে এই চিত্র।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, “যদি কেউ হকারমুক্ত পরিবেশের সুযোগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, তাহলে একাধিক মোবাইল কোর্ট মাঠে নামবে। অতিরিক্ত দাম বা যানবাহনে ভাড়া আদায় করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি জানান, সিএনজি চালকদের জন্য নতুন করে ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে চালক ও মালিকদের নিয়ে শিগগিরই বৈঠক ডাকা হবে।

জেলা প্রশাসক পরিদর্শনের সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাবেদ হোসেন চৌধুরীর কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “গতকাল চারজন ব্যবসায়ী ফুটপাত দখল করেছিল, তাদের মোটা অঙ্কের জরিমানা করেছেন, এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। আইন প্রয়োগে আরও কঠোর হতে হবে।”

হাজীগঞ্জ বাজারকে হকার ও যানজটমুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখায় জেলা প্রশাসক সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার সদস্য, পৌরসভা, সাংবাদিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনসাধারণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “এটি একক কোনো সংস্থার কাজ নয়, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাজারে এই পরিবর্তন এসেছে।”

জেলা প্রশাসকের সফরসঙ্গীদের মধ্যে আরও ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাজীগঞ্জ-ফরিদগঞ্জ) সার্কেল মুকুর চাকমা, হাজীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিউদ্দিন ফারুক, হাজীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আরিফসহ স্থানীয় সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিরা।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ দোকানদার ও সাধারণ মানুষ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। হাজীগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন বলেন, “প্রশাসনের এমন উদ্যোগ অনেক আগে নেওয়া উচিত ছিল। এখন আর কেউ দোকানের সামনে জোর করে হকার বসাতে পারছে না।”

স্থানীয় পথচারী রাশিদা বেগম বলেন, “আগে রাস্তায় হাঁটা যেত না। এখন যেন নতুন এক বাজারে হাঁটছি মনে হয়।”

স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে হাজীগঞ্জ বাজার স্থায়ীভাবে হবে একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপদ বাজার। তবে, হকারদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অনেকে।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’