শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

নদীর ওপর ৪৭৮৩ কোটি টাকার ব্যয়ে

মতলব-গজারিয়া ঝুলন্ত সেতু প্রকল্প পরিদর্শনে কোরিয়ান প্রতিনিধি দল

মনিরুল ইসলাম মনির প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ৮:১৬ পিএম
মতলব-গজারিয়া ঝুলন্ত সেতু প্রকল্প পরিদর্শনে কোরিয়ান প্রতিনিধি দল
চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যে স্বপ্ন বুকে লালন করে আসছিলেন, ধনাগোদা নদীর ওপর সেই দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের কাজ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি। ৪ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই ১.৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কেবল স্টেইড সেতু হবে দেশের ইতিহাসে প্রথম এমন প্রকল্প, যেখানে নদীর মূল প্রবাহে একটিও পিলার থাকবে না।
শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে সেতু এলাকার ওপর আকাশপথে হেলিকপ্টার সার্ভে করেন কোরিয়ান ফান্ডিং এর প্রতিনিধি মিস্টার বিয়ন, মিস্টার পার্ক, মি. সিন এবং দোভাষী মো. বাবলু ভূঁইয়া। পরিদর্শন শেষে তারা হেলিকপ্টারটি অবতরণ করেন মতলব উত্তর উপজেলার কালিপুর বাজার সংলগ্ন মাঠে। সেখানে স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তারা প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে মতবিনিময় করেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত ও দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এই সেতু শুধু মতলব নয় চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা পাল্টে যাবে। এই সেতু দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে। শিল্পাঞ্চল, পর্যটন ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সেতু হলে মতলব-গজারিয়া অঞ্চল রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যুক্ত হবে।
এতে আরও বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ওবায়দুর রহমান টিপু, জেলা বিএনপি সহ সভাপতি অধ্যাপক ডা. শামিম আহাম্মেদ, কেন্দ্রীয় সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সভাপতি আজহারুল হক মুকুল, বিএনপি নেতা আনিছুর আউয়াল প্রমুখ। সভাটি সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মিয়া মনজুর আমিন স্বপন।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, ছেংগারচর পৌর বিএনপির সভাপতি নান্নু মিয়া প্রধান, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল পাটোয়ারী, উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রাশেদুজ্জামান টিপু, উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শাহজালাল, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নুরুল হুদা ফয়েজী, সদস্য সচিব জয়নাল পাটোয়ারী পিনু’সহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
জানা যায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪,৭৮৩ কোটি টাকা, যার বড় অংশই অর্থায়ন করবে দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ইডিসিএফ। ঋণের সুদের হার মাত্র ০.০১%, পরিশোধকাল ৪০ বছর এবং ১৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড যা বাংলাদেশে যেকোনো সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে অন্যতম সাশ্রয়ী বিদেশি অর্থায়ন। ১.৮৫ কিলোমিটার মূল সেতুর পাশাপাশি ৭.৫১ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ২.২ কিলোমিটার নদী শাসন ১টি টোল প্লাজা ও ২টি ওজন স্টেশন ২.১ কিমি ইন্টারচেঞ্জ (ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঘ–১ অংশে) নির্মিত হবে। সেতুর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স ২৫ মিটার যা ভবিষ্যৎ নৌপরিবহন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
এর আগে গত ৬ নভেম্বর সেতুর স্থান পরিদর্শনকালে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ,সেতু মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ভিখারোদ্দৌলা ভুলু চৌধুরী’সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
সেতুটি নির্মিত হলে, রাজধানীর সাথে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ভোলার সাথে ঢাকার সরাসরি যাতায়াত সময় অর্ধেকে নেমে আসবে, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের চাপ কমবে, দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্য ও পর্যটনে বড় পরিবর্তন আসবে, জমির মূল্য বৃদ্ধি ও নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, জিডিপিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আসবে (০.২৩% পর্যন্ত)।

৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৯ পিএম
৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে গ্রামের সড়কের চিত্র বদলে দিলেন মসজিদের ইমাম রেজাউল

মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর ধরে বৃক্ষরোপণ করে আসছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে বিভিন্ন সড়কের পাশে হাজার হাজার গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে গড়ে তুলেছেন সবুজের আবরণ। তার লাগানো সারি সারি তালগাছে বদলে গেছে গ্রামের একটি সড়কের চিত্র।

স্থানীয়দের কাছে রেজাউল কিবরিয়া বাবুল একজন ইমাম হিসেবে পরিচিত হলেও বৃক্ষপ্রেমী হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। তিনি ওমরপুর ইউনিয়নের কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। ইমামতির পাশাপাশি অবসর সময়ে গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন দশক আগে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেন রেজাউল কিবরিয়া। ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন। সেখান থেকে উৎপাদিত ও সংগ্রহ করা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা এলাকার সড়কের পাশে রোপণ করতে শুরু করেন। একই সঙ্গে মাইকিং করে স্থানীয়দের গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতেন।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, ফলজ ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ। ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন বড় হয়ে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে পুরো সড়কটি যেন সবুজে ঘেরা একটি প্রাকৃতিক পথ। গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখন এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন।

Model Hospital

শুধু বাউল সড়ক নয়, ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি। চারা রোপণের পর নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও বৃক্ষরোপণের কাজ থেকে পিছিয়ে যাননি তিনি।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি কোনো প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে একজন ইমামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে গাছ লাগানোর এই প্রচেষ্টা শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্যই বদলায়নি, বরং স্থানীয়দের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ তৈরি করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠায় সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।

রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।’

তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।

তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।

রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, ‘আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।’

তার ভাষ্য, গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তোলাই তার লক্ষ্য। একই সঙ্গে তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বান জানান তিনি।

রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, ‘গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’